শেখ হাসিনা সংবিধানের যেসব এবিউজ করেছেন তার মধ্যে একটি হচ্ছে রুলস অব বিজনেসকে ব্যবহার করে সংবিধানকে বাইপাস করা। মন্ত্রিসভাকে সাংবিধানিক সীমার বাইরে বড় করার জন্য মন্ত্রী-উপমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা পরিষদ নিয়োগ করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা ছিল এরই অংশ।
আশ্চর্যজনকভাবে, দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জিতে বাংলাদেশের নতুন সরকার সেই এবিউজকেই কন্টিনিউ করছেন। তারা সরকারের প্রথম দিনেই ছাড়িয়ে গিয়েছেন শেখ হাসিনাকে। মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় ৫ জন করে মোট ১০ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যেখানে ৫০ জনের একটি বড় মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে, তাকে আরও বড় করা হলো এই ১০ উপদেষ্টা নিয়োগের মাধ্যমে।
সংবিধান অনুযায়ী (অনুচ্ছেদ ৫৫), মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ টেকনোক্রেট (সংসদ সদস্য নন এমন) নিয়োগ দেয়ার সুযোগ রয়েছে। সে হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার ৫০ জনের মন্ত্রিসভায় সর্বোচ্চ ৫ জন নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে এই ব্যাপারে তিনি কিছুটা সংযম দেখিয়ে ৩ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন।
তাহলে এবিউজ কিভাবে হচ্ছে? মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান মূল সংবিধানে নেই। মিনিস্টার/উজির/মন্ত্রী আর উপদেষ্টা আসলে একই পদ; নামধাম বদলে আমরা কেবল একে পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করছি। সংসদ সদস্যের বাইরে যেহেতু মন্ত্রিসভায় ১০ শতাংশের বেশি নেয়ার সুযোগ নেই, তাই উপদেষ্টা নেয়ার এই পথ বের করা হলো। তা-ও আবার একই মর্যাদায়।
২০০৯ সালে রুলস অব বিজনেসে সংশোধনীর মাধ্যমে 3B যুক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর যত খুশি তত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় উপদেষ্টা বানানোর সুযোগ তৈরি করা হলো। এটি 'Abusive Constitutionalism'-এর এক প্রকৃষ্ট নমুনা। অথবা ন্যূনতম পক্ষে অসাংবিধানিক। আইনি ক্রমানুসারে রুলস অব বিজনেস একটি 'সাব-অর্ডিনেট লেজিসলেশন' মাত্র। সংবিধান যে ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীকে দেয় না, সেই ক্ষমতা রুলস অব বিজনেসের মাধ্যমে দেয়া যায় না; প্রেসিডেন্টের বানানো আদেশ হিসেবে রুলস অব বিজনেসের সংবিধান অতিক্রম করার সুযোগ নেই। এটি স্পষ্টত একটি 'একজিকিউটিভ ওভাররিচ' বা নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন।
আরো দুটি বিষয় এর সাথে জড়িত। প্রথমত, যদি ধরেও নেয়া হয় এই অসাংবিধানিক চর্চা প্রয়োজনীয় তবে এসব উপদেষ্টাদের নিয়োগ হতে হবে জনস্বার্থে। জনস্বার্থে শেখ হাসিনা তার উপদেষ্টাদের নিয়োগ করেছেন কিনা এ ব্যাপারে সম্ভবত কোন আদালতে প্রশ্ন উঠেনি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মাপার এটিও একটি ক্ষুদ্র টুল হতে পারে! আজকে গঠিত সরকারে ঠিক কোন জনস্বার্থে ১০ জন উপদেষ্টার প্রত্যেককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে আমরা হয়তো ভবিষ্যতে জানতে পারব।
সবচে অগণতান্ত্রিক বিষয় হচ্ছে এসব উপদেষ্টার কোনো সংসদীয় জবাবদিহিতার সুযোগ নেই। তারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করলেও জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে দায়বদ্ধ নন। এটি সরাসরি 'সেপারেশন অব পাওয়ার' নীতির পরিপন্থী। এই ব্যবস্থা আসলে সংবিধানে উল্লিখিত 'যৌথ দায়বদ্ধতার' ধারণার সাথে উপহাস।
সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কী করুণ দশা আমরা দেখছি!
-
১৭/২/২০২৬

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International License.
No comments:
Post a Comment