Monday, March 16, 2026

জুলাই আদেশ বিষয়ে

জুলাই আদেশ বিষয়ে 

ছবি: জেমিনাই

তর্ক এবং কুতর্ক আলাদা নিশ্চয়ই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে সাংবিধানিক মুহূর্ত তৈরি হয়েছে তাকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য দেয়া যুক্তির অধিকাংশই কুতর্ক। অনেক দুঁদে আইনজ্ঞ, বুদ্ধিজীবি, এবং রাজনীতিবিদ সেসব কুতর্কের দোকানদারিতে লিপ্ত হয়েছেন। বলার অপেক্ষা রাখেনা এর বড় ব্যবসায়ী বা ট্রেডার হচ্ছেন বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থার সুবিধাভোগী স্বৈরাচারি দল। এই কুতর্কের মেলায় নতুন স্টল খোলার ইচ্ছা আমার নাই। তবে কুতর্ক সহজ, সৎ থাকা বা দায় নেয়ার বালাই নেই; হয়তো গভীরভাবে ভাবারও দরকার হয় না। ঈশপের বাঘের জন্য খরগোশের বাপদাদার অজানা ছুঁতাও যথেষ্ট। দুরাচারি বাঘের জন্য যাহা ইষ্ট ছাগল-জনগণের জন্য তাহা নহে। গণভোট কতটা ঘন বা পাতলা হইলো তাতে বিড়ালের মীন শিকারে জলঘোলা করিতে কোন অক্ষমতা নেই।

(ক) জুলাইয়ে বিপ্লব হইয়াছে নাকি অভ্যুত্থান হইয়াছে তাহা নিয়া তর্কটা আপাত অদৃশ্য হইলেও রাজনৈতিক বয়ানের তলে তলে প্রবাহমান। প্রবাহমান সেই তন্বী নদীটিকে বড় ভাল লাগিতেছে রাজনৈতিক দল ও নেতাদিগের। (আমার যেমন ভাল লাগছে ভাল লাগছে - গুরু চণ্ডালি।) বিপ্লবী সেই অভ্যুত্থান যে ‘গণ’ হইয়াছিল তাহাতে কোন পক্ষ বা পক্ষী আজতক আপত্তির কিচিরমিচির তুলে নাই। কাজেই অবিসংবাদিত ভাবেই স্বীকার করা যাইতেছে জুলাইয়ে হয়েছিল ‘গণ’অভ্যুত্থান; সামরিক অভ্যুত্থান নহে, নহে তা দলীয় অভ্যুত্থান। হজরত রকম শাহ যেমন চক্ষে আঙ্গুল দিয়া দেখাইতে চাহিয়াছেন যে, এইরকম ‘স্পটলেস’ গণঅভ্যুত্থানের নমুনা বাংলার ইতিহাসে নাই। যে অভ্যুত্থান এরকম নিদাগ, রাজনৈতিক দলের সাথে তার আগে কভু হয়নিকো দেখা।

গণঅভ্যুত্থান যেন গণরুম বা গণশৌচাগারের মত ‘সুপারমেজরিটির’ উৎসবের এককোণে একটি এতিমের মত আমাদের নজর এড়াইয়া কাদিতে পারে, সরকারি দল বুঝি সেই উদ্যোগেই বাজনা বাজাইতেছেন। জুলাইয়ের “দলীয়অভ্যুত্থানের” ইতিহাস সম্ভবত পাতলা কার্টেনে বানানো হইতেছে, সকলেই চোখের আলোয় দেখিতেছেন প্রবঞ্চনার পর্দার ভেতরে। 

(খ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব সালাহউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক প্রখরতা, কথাবার্তায় প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিমিতিবোধ প্রশংসনীয়। ২৪ ঘণ্টাই কেউ হিরো নয়। রাজনীতি ত পিছলা জায়গা বটে। চটকদার কথাও মাঝে উইটি (witty) হয়। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ (জুলাই আদেশ) বিষয়ে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য চটকদার হলেও তা কুতর্ক। বাংলা ভাষায় বিভিন্ন পদে জেন্ডারের আধিপত্য অন্য ভাষার (যেমন আরবি ফরাসি বা খোদ আংরেজির) চেয়ে কম। তথাপি তিনি ‘জুলাই আদেশ’-এর জেন্ডার খুঁজে সবাক হয়েছেন - যে তা ম্যাসকুলিন বা ফেমিনিন না, মনে হয় ‘নিউটার’ জেন্ডার।

যদি খানিকটা কুতর্ক তুলিবার বাকস্বাধীনতা সকলেরই থাকিয়া থাকে, তবে কি মাননীয় মন্ত্রী সমীপে এই প্রশ্ন তুলিব যে, গণভোটের রায় মেনে কাজ করিতে যে বেতালবাহানা বিএনপি শুরু করিয়াছে তাতে তাহা শয়তান নাকি ফেরেশতা বুঝিতে পারিতেছি না; তবে কি বিএনপি বাংলাদেশের ‘পলিটিকেল পার্টি’? 

(গ) প্রথম আলোতে মাননীয় মন্ত্রীর যে বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে তা অনেক ক্ষেত্রে স্ববিরোধী। তবে সেসবের আলোচনা কুতর্ককে লম্বা করিবে। একটি বিষয়ে বলিতেই হবে। 

তিনি দাবি করছেন সংসদ সার্বভৌম। যদিও এই দাবির সাংবিধানিক উৎস কি তা তিনি খোলাসা করেন নাই। এই দাবি স্পষ্টত ৭ অনুচ্ছেদের বিপরীত। ৭ অনুচ্ছেদ আরেকবার দেখে নিলেই বুঝবেন। 

“৭৷ (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে৷ 
(২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে৷”

এইখানে দফা ১ অনুযায়ী দেশে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষমতা চর্চা হবে। আর ২ দফা অনুযায়ী জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ হিসেবে সংবিধান সর্বোচ্চ আইন হিসেবে কার্যকর হবে। 

আইন ব্যাখ্যার রীতি অনুযায়ী দফা ২ বাদ দিয়ে শুধু ১ পাঠ করার সুযোগ নাই। সংবিধান সর্বোচ্চ। যেখানে সংবিধান সর্বোচ্চ - বৃটিশ ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত - সেখানে বৃটিশ ব্যবস্থার নীতি ‘সংসদ সার্বভৌম’ বাংলাদেশের সংবিধানে আছে মনে করা স্পষ্টত সঠিক নয়।

তবে আরো গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। জনগণের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কেন রাষ্ট্রক্ষমতা চর্চা হবে? অথবা সংবিধান কেন সর্বোচ্চ আইন? এই দুই প্রশ্নের উত্তর এক। রাষ্ট্রের ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণের ইচ্ছার পরম প্রকাশ হওয়ার কারনেই সংবিধান সর্বোচ্চ আইন। কিন্তু প্রতিনিধিদের ক্ষমতা তার মালিককে ছাড়িয়ে যাবে যদি কেউ দাবি করে সংসদ সার্বভৌম। 

বাংলাদেশে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ক্ষেত্রে সার্বভৌম হচ্ছে জনগণ। আর সেই ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে সংসদ। এবং প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে সংবিধান মেনে চলতে হবে। কেননা সংবিধান হচ্ছে সার্বভৌম জনগণের ‘অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি’। আর জনগণের ইচ্ছাই সংবিধান, সংসদ, মন্ত্রিপরিষদ - সবকিছুর বাপ-মা।

সংসদকে সার্বভৌম বলার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের পক্ষে যে আপাত গণতান্ত্রিক সংসদের প্রাইমেসির সুবিধা তৈরি হয়, তাতে ঝুঁকি আছে হাওয়া বদলের সাথে আদালতের রায় বদলের। এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে গেলে সাংবিধানিক রাজনীতির এক চক্রে আটকা পড়বে এদেশের মানুষের উৎপাদনশীল এবং সৃজনশীল শক্তি। কাজেই উত্তম সিদ্ধান্ত হচ্ছে রাজনৈতিক এবং  সাংবিধানিকভাবে জনগণের চুড়ান্ত ক্ষমতা তথা গণসার্বভৌমত্বকে মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা। গণভোটের রায় মেনে চলা।

(ঘ) জনগণ গণভোটের প্রশ্ন বুঝে না, ৪টি প্রশ্নে একত্রে ছিল, এই যুক্তি দুর্বল। বিপরীত উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে। জনগণ কি বিএনপির ৩১ দফা আর দীর্ঘ ইশতেহারে সচেতনভাবে ব্যবহৃত শব্দের মারপ্যাচ বুঝে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে? 

যদি ধরেই নিই বুঝে নাই, তাতে সবাই বুঝলেই কি ‘না’ ভোট দিত? কেউ যদি দাবি করেন যে জনগণ বুঝে নাই - বুঝলে নব্বই ভাগের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিত, তার জবাব কি হবে? বরং এসব কুটতর্ক দীর্ঘ করার খৈ কেন আমরা ভাজব? 

(ঙ) আইনের টেকনিক্যাল তর্ক আর রাজনৈতিক কুতর্ক এড়িয়ে বরং রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবা উচিত বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সবচে উত্তম পদক্ষেপ কি? রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এমন ঐতিহাসিক সুযোগ কদাচিত আসে। জুলাই আদেশ মেনে নিলে বিএনপির হারানোর কিছু নেই। বরং অর্জন আর গৌরবের ভবিষ্যতই তৈরির সুযোগ রয়েছে।
-
.../ ১৬ মার্চ ২০২৬

Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International License.

জুলাই আদেশ বিষয়ে

জুলাই আদেশ বিষয়ে  ছবি: জেমিনাই তর্ক এবং কুতর্ক আলাদা নিশ্চয়ই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে সাংবিধানিক মুহূর্ত তৈরি হয়েছে তাকে ব্যর্থ করে ...