Thursday, June 24, 2021

ক্লান্ত ইউনিকর্ন



তোমার ঘ্রাণ পেতে ব্যাকুল হয়ে ছিলাম বহুকাল।

যারা বৃক্ষের মতন স্থির
অপেক্ষায় তাদের শেকড় গজায়,
হয়তো তাদের ভোতা খুড়ে লুকানো থাকে অদৃশ্য শেকড়…
বৃক্ষের তপস্যা আমার হৃদয়ে নেই।
আমি সময় ভাঙি অনন্ত সময়ের দিকে চেয়ে
যেখানে উড়ে যায় নক্ষত্র অথবা ধ্রুবনক্ষত্রের স্বর –
অসংখ্য চন্দ্রগ্রস্থ রাতে
নির্লীপ্ত জোৎস্নাগলা নিঃসঙ্গতায়
ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে
নক্ষত্রের পানে তাক করা আমার কপালে গজিয়েছে একটি শিং
প্রতিটি একান্ত আলো-আধারির ক্ষণে
আমার আর হাত থাকে না
বাতাস কিংবা জোৎস্না ছুঁয়ে দেখার
আমার চোখে বাতাস লাগে
নাকে চাঁদের ঘ্রাণ
ঠোট শুধু কাঁপতে থাকে
তোমার জড়তার মত
অপেক্ষা অসংখ্য সবুজ ঘাস শুকনো খড়ের গাদা
তুমি অথবা প্রেম এক লুকানো সুঁই
আমার শ্বাস প্রশ্বাসের সুতারা যেন জানে কোথায় খুঁজতে হবে হবে তোমায়
অতঃপর অপেক্ষার ঘাসের মাঠে খুঁজতে খুঁজতে
তোমার ছায়া
আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হই এবং দাঁড়িয়ে থাকি অলৌকিক অশ্বের মত
শুনেছি ইতিহাসের শৈশবে সিন্ধু নদীর পাড়ে
তোমার ঘর ছিল
ঢেউয়ে ঢেউয়ে দুলতে থাকা
গাঢ় অন্ধকারে
ফসলের সুখ পেরিয়ে
ডুমুর গাছের ছায়া
তোমাকে বসতে দিত
মায়ার হৃদয় পেতে
(হয়তো সেও অপেক্ষায় ছিল তোমার!)
শিকারী সমাজ যারা পোষে পালোয়ান
আমাকে বধ্য ভেবে ছুঁড়ে তীর হানে বর্শা পাতে ফাঁদ
তীক্ষ্ম ঈর্ষা, তীব্র ঘৃণা, গহন উপেক্ষায়
বধ করতে চায় তারা নিরন্তর;
তোমার প্রেম বা প্রেমাধিক প্রেম
আমায় ভুলিয়ে রাখে
প্রেমের ভিতর।
-
জুন ২৩, ২০২১
Image: Kitiara, 2018 / www.goodfon.com

Sunday, June 20, 2021

খড়ি মোল্লাদের মাসনা সুলাসা

ইদানিং কিছু ফাতরা টাইপের মোল্লার উদয় হয়েছে। এরা ইসলাম সম্পর্কে দুয়েক পাতা পড়লেও কাণ্ডজ্ঞানের দিক থেকে বেক্কল। এদের কাঠমোল্লাও বলা যাবে না, খড়ি মোল্লা বলা যেতে পারে বড় জোর। এরা মাসনা সুলাসার আলাপ করে বেড়ায়। এদের ইসলাম সম্পর্কে বুঝ কম, কাণ্ডজ্ঞানও খারাপ।

কোরআনের বিবাহ সংক্রান্ত আয়াতে ‘আমর’ বা আদেশসূচক ক্রিয়াপদ ব্যবহার করা হলেও তা আবশ্যক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। অধিকাংশ আলেম বিয়ে ফরজ হওয়ার বিষয়কে শর্ত সাপেক্ষ মনে করেন। বিয়ে ফরজ হওয়ার নিয়ম আর্থিক সক্ষমতা থাকার পর শারীরিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার উপর নির্ভরশীল। কারো শারীরিক চাহিদা আছে, কিন্তু পয়সা নাই – তার জন্য পরামর্শ হলো রোজা রাখা। (এখন রোজা না রেখে শারীরিক চাহিদা বাড়ায় এমন খাবার বর্জন করার মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।) মজার বিষয় হচ্ছে – এই একই পরামর্শ বাংলাদেশে উতলা হয়ে যাওয়া কিছু ফাতরা মোসলমান পুরুষদের বেশি বেশি শোনা উচিত। তাদের যদি মনে হয় শরীর তাদের খুব উৎপাত করছে, তাদের উচিত রোজা রাখার মত মহতী ইবাদতে মশগুল থাকা। উত্তেজক খাবার না খাওয়া। সমাজে ফাতরামি ছড়ানোর দরকার নেই।

একাধিক বিয়ের বিষয়টি ব্যতিক্রমি নিয়ম। সাধারণ নিয়ম নয়। কেউ যদি বিয়ে করতে না চায়, তাও একটি ব্যতিক্রমি বিষয়।

এক স্ত্রী বিদ্যমান থাকা অবস্থায় দ্বিতীয়/তৃতীয়/চতুর্থ বিয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনে বাধা নেই। পুরুষের জন্য বহুবিবাহ নিষিদ্ধ নয়। তবে বিবাহিত থাকা অবস্থায় আরো বিয়ে করতে চাইলে আইনগত পদ্ধতি ও শর্ত মানতে হবে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনগত পদ্ধতি ও শর্তগুলো শরীয়ার কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন এবং সুষম ব্যাখ্যা বলা চলে। কোরআনের সাবধান বাণী ‘আর যদি তোমরা ভয় পাও যে তোমরা ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে পারবে না’—র আইনি রূপ পাওয়া যায় এসব শর্ত ও পদ্ধতিতে।

শর্তগুলো কি?

১. সালিশের মাধ্যমে এমন বিয়ের অনুমতি পেতে হবে। কেউ যদি মনে করে বিবাহিত অবস্থায় তার আরো বিয়ে করা প্রয়োজন – এই সিদ্ধান্ত সে নিজে নিলে তার পক্ষপাতমূলক বা বায়াসড হওয়ার ঝুঁকি আছে। এছাড়া বর্তমান স্ত্রীর স্বার্থ জড়িত থাকায় তার প্রতিনিধিত্ব ছাড়া সিদ্ধান্ত ন্যায্য হতে পারে না। তাই সালিশ গঠিত হবে স্বামীর প্রতিনিধি, বর্তমান স্ত্রীর প্রতিনিধি নিয়ে। এই সালিশ যদি যৌক্তিক এবং প্রয়োজনীয় মনে করে তবে কারণ উল্লেখপূর্বক এবং যদি কোন পক্ষের কোন যৌক্তিক শর্ত থাকে সেই শর্ত সাপেক্ষে এমন বিয়ের অনুমতি দিতে পারে।

সালিশের সিদ্ধান্তে যদি কেউ সন্তুষ্ট না হয় তবে সে আদালতের কাছে যেতে পারে। এক্ষেত্রে আদালতের সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

২. প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিদ্যমান স্ত্রী/স্ত্রীগণের অনুমতি। তাদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবে না।

শর্ত লঙ্ঘন করলে তাকে দুটি পরিণতি ফেইস করতে হবে – প্রথমত, তৎক্ষণাৎ স্ত্রীর দেন মোহর সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে; দ্বিতীয়ত, এক বছর কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় ধরনের শাস্তি পেতে হবে।


মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, ধারা ৬

বহুবিবাহ:

১) কোন ব্যক্তি বিবাহিত অবস্থায় সালিশী কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া আর বিয়ে করতে পারবে না; বা এধরনের অনুমতি ছাড়া কোন বিয়ে ১৯৭৪ সনের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন এর অধীনে নিবন্ধিত হবে না।

২) ১নং উপধারা অনুযায়ী অনুমতির জন্য নির্ধারিত ফিস-সহ চেয়ারম্যানের কাছে দরখাস্ত করতে হবে; এবং তাতে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ এবং এ বিয়ের ব্যাপারে বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের সম্মতি নেয়া হয়েছে কিনা তা উল্লেখ থাকবে।

৩) ২নং উপধারা অনুযায়ী দরখাস্ত পাওয়ার পর চেয়ারম্যান দরখাস্তকাী ও বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের প্রত্যককে একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলবেন। (প্রতিনিধিদের নিয়ে) গঠিত সালিসী কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিয়ে প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত মনে করলে যৌক্তিক শর্ত থাকলে তা সাপেক্ষে দরখাস্ত মঞ্জুর করতে পারেন।

৪) দরখাস্তের বিষয় নিষ্পত্তি করার ক্ষেত্রে সালিশী কাউন্সিল কারন উল্লেখ করবেন; নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যে কোন পক্ষ নির্দিষ্ট ফিস দিয়ে নির্দিষ্ট দফতরে সহকারী জজের নিকট রিভিশনের জন্য আবেদন করতে পারে; এ বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত বিবেচিত হবে এবং কোন আদালতে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

৫) কোন ব্যক্তি যদি সালিশী কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া অন্য বিয়ে করে তবে সে-

ক) বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগনের তলবী ও স্থগিত দেনমোহর সম্পূর্ণ তৎক্ষনাৎ পরিশোধ করবে। দেনমোহর পরিশোধ না করলে তা বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হবে; এবং

খ) অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।


এই আইন ভাল না খারাপ সেই মোরালিস্ট আলোচনা এখানে করতে চাই না। তবে খড়ি মোল্লাদের যদি জিজ্ঞেস করেন, ইসলামে কি নারীদের দাসী হিসেবে রাখার বৈধতা আছে কিনা? তারা তখন আইসিসের মতন যৌনদাসী খুঁজতে কিতালের জন্য বেড়িয়ে পড়তে পারে।

Friday, March 12, 2021

টর্চার, শিক্ষা, ও সেক্যুলারিজম

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ (BLAST and ASK versus Bangladesh, Writ Petition No.5684/2010) ২০১১ সালের শুরুতে রায় দিয়েছিল। রায়ের প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালা প্রণয়ন করেছে একই বছর।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি বাংলাদেশের অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান বাদে সর্বত্র ছিল। রায়ের ১০ বছর পার হয়েছে। ১০ বছরে অগ্রগতি ভাল বলা যায়। আশা করা যায় ২০৩০ এর দিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের টর্চারের মানসিকতা থাকবে না।
যদিও টর্চার যে নিষেধ এই কথা আমার স্টুডেন্টদেরকে বুঝাতে কষ্ট হয়েছে। বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে টর্চার বিদায় করার জন্য যে নৈতিক সাপোর্ট পরিবার এবং রাষ্ট্র থেকে আসবে – সেই পরিবার এবং রাষ্ট্র টর্চার জারি রাখলে তা হবে না। পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে টর্চারমুক্ত করার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের টর্চার বন্ধ করতে হবে। কারন যে মৌলিক অধিকার (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫ এবং অন্যান্য) প্রয়োগের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি (টর্চার) নিষিদ্ধ সেই মৌলিক অধিকার রাষ্ট্র তার আইন শৃংখ্যলা বাহিনীর মাধ্যমে লঙ্ঘন করতে পারে না।
উল্লেখ্য, যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক মানসিক শাস্তি বন্ধ করা হয়, তখন ক্বওমী মাদরাসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল না। মাদরাসা (আলিম পর্যন্ত) এবং অন্যান্য সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ থাকলেও মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় ক্বওমী মাদরাসার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। যদিও ‘অন্যান্য সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ বলতে ক্বওমী মাদরাসাকেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়; এবং সে হিসেবে ক্বওমী মাদরাসা উক্ত নীতিমালার বাইরে নয়।
২০১০ এর দশকে বাংলাদেশে তথ্যের গতি বেড়েছে ইন্টারনেটের কারনে। তাতে এই ধরনের টর্চারসহ আরো সব ডেভিয়েন্সের খবর আমরা জানতে পারছি। ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া সমাজের এবং রাষ্ট্রের ছবি দেখায়ে দিচ্ছে খুব সহজেই। ২০১১ সালের এই ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বাড়লেও ক্বওমী মাদরাসায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের পরিমান বেড়েছে সম্ভবত অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরে। তথ্য প্রযুক্তির সাথে সমাজের এই পরিবর্তনের সংযোগ আছে। সমাজে যে ডিজিটাল ডিভাইড বিরাজমান তা আরো বড়সড় অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাচ্চা। এই বৈষম্যের নানান রকম প্রকাশের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি।
এছাড়া বাঙালি মোসলমান এখনো বিদ্যা বিতরনে কৃপণ। বিশেষত আধুনিক শিক্ষিত কিংবা সেক্যুলার বাঙালি শিক্ষা বিস্তারে ততটা আগ্রহী বা সফল নয়। শিক্ষার ভার পীর সাহেব আর দুনিয়াদারির খোঁজ না রাখা মাওলানা-মৌলবিদের হাতে দিয়ে মানুষের সুন্দর দুনিয়াবি জীবন হবে না। আপনারা সেক্যুলারিজমকে শুধু মন্ত্র হিসেবে বিশ্বাস করলে অন্যের ইহকাল ভাল হবে না। অন্তত সকলের ইহকাল বা দুনিয়ার জীবনকে সহজ সুন্দর করে তোলার চেষ্টা না থাকলে আপনি বরং সেক্যুলারিজমকে এন্টিরিলিজিয়াস এক্সট্রিমিজিম থেকে মুক্ত করতে পারবেন না। বাংলাদেশে সেক্যুলারিজমের এই স্ববিরোধী হয়ে উঠার দায় পুরাটা নন-সেক্যুলারদের নয়, সেক্যুলারিজমের সমর্থকদেরও।
গত কয়েকবছরে অনেকেই দরদী হয়ে উঠছেন। অন্তত ক্বওমী মাদরাসায় পড়ুয়া শিশুদের নিজেদের শিশু হিসেবে ভাবতে পারছেন অনেকে। আরো বেশি দরদী হয়ে উঠলে এই সমাজে ধর্মের সত্যিকার পর্যালোচনা সম্ভব হবে।
টর্চার, শিক্ষা, সেক্যুলারিজম। মার্চ ১১, ২০২১/ নরমাল, ইলিনয়

৭ই মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ রেটরিকে আগ্রহী যে কারো কাছে একটি অসাধারণ এবং সফল ভাষণ। রেটরিকের যে তাৎক্ষণিক প্রভাব একজন ওরেটর বা বক্তার আকাঙ্ক্ষিত থাকে এই ভাষণের মাধ্যমে তা অর্জিত হয়েছে।

কিন্তু ৭ই মার্চের ভাষণ শুধু রেটরিক বা নান্দনিক এক ভাষণে সীমাবদ্ধ নয়। ভাষণের সৌন্দর্য বর্ণনা করে নির্মলেন্দু গুণ তার সেরা একটি কবিতা রচনা করেছেন, ভাষণের ব্যকরণ বিচার করে এর প্রশংসা লিখেছেন আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
এছাড়া এই ভাষণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় এর নাম উঠেছে। তবে এই ভাষণের সংরক্ষণে বাংলাদেশের দুর্বলতা লজ্জাজনক। ভাষণের একাধিক ভার্সন আছে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। রাষ্ট্রের আইসিটি ডিভিশনের প্রচারিত রেকর্ড, ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্ম এন্ড পাবলিকেশন্স এর প্রচারিত রেকর্ড, এবং সংবিধানে সংযুক্ত ভাষণের লিখিত রূপ – এ তিনটি রেকর্ডে সামঞ্জস্য নেই। তাছাড়া সম্পূর্ণ ভাষণটি কোথাও পাওয়া যায় না। ভাষণটি কত মিনিট লম্বা ছিল তা নিয়ে একাধিক মতামত আছে। রেকর্ড সংরক্ষণের দুর্বলতা তথা ইফিসিয়েন্সির ঘাটতি ছাড়াও বাঙালি কালচারে রেকর্ড সংরক্ষণে সততার ঘাটতিও প্রকট। রাজনৈতিক দলগুলো এ ব্যাপারে খুবই অদক্ষ। (মুক্তিযুদ্ধে যারা নিহত হয়েছেন তাদের কোন পূর্ণাঙ্গ তালিকা না থাকা রেকর্ড সংরক্ষণে ব্যর্থতার বড় প্রমাণ। হিটলারের জার্মানির রেকর্ড সংরক্ষণের দক্ষতার কারনে হলোকাস্টের ভয়াবহতা জানা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে শিখেছে গুম। আর তথ্যগুম শিখেছে বৃটিশ শাসনের অফিসিয়াল সিক্রেসি আইন থেকে।) ৭ই মার্চের ভাষণটিকে কাঁটাছেড়া করা এবং তার পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড না রাখার ব্যর্থতা প্রথমত আওয়ামী লীগের। যেহেতু বাংলাদেশের মানুষের চিন্তাজগত ইতিহাসকে দেবতা ও দানবে বিভাজিত আকারে দেখায় প্রভাবিত – তাই ইতিহাস কাঁটাছেড়া করার মত নির্লজ্জ, হীন, অপমানজনক এক আচরণ এখানে টিকে আছে।
ভাষণের রেটরিক হিসেবে সাফল্য, সৌন্দর্য, স্বীকৃতি, এবং রেকর্ড সংক্রান্ত ব্যর্থতা ছাড়াও এর রাজনৈতিক মূল্য আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের জন্য আওয়ামী লীগের প্রস্তুতিহীনতার যে কথা বাজারে আছে তা এই ভাষণের সামনে টিকে না। ২৬শে মার্চ যে স্বাধীনতার ঘোষণা কোন অভিনব বিষয় ছিল না তার নির্দেশনা এই ভাষণে পাওয়া যায়।
এই ভাষণ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে সেই প্রশ্ন করা যায়। যেই শোষন এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান ছিল সেই শোষণ এবং বঞ্চনা কি শেষ হয়েছে?
নাগরিক অধিকার রক্ষার যেই শাসনকাঠামো বানানোর বাসনা এই ভাষণে ঘোষিত হয়েছিল তা কি হয়েছে?
আইন দর্শনের একটি প্রশ্ন আমরা আলাপ করতাম। নাগরিকের আইন অমান্য করার অধিকার আছে কিনা? থাকলে কখন? ৭ই মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের ইতিহাসে civil disobedience এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যখন কোন শাসক জনগণকে তাদের পছন্দমত সরকার গঠন করতে না দেয়, তাদের সাথে প্রতারণা করে, এবং নির্যাতন নিপীড়নের মাধ্যমে তাদের অধিকার অস্বীকার করে – তখন জনগণের নৈতিক অধিকার থাকে সরকার এমনকি রাষ্ট্রকে অমান্য করার। ৭ই মার্চে এদেশের জনগণ সেই নৈতিক অধিকারের চর্চা করেছেন। এই অধিকারের আলাপ আইনের কাঠামোর মধ্যে আর মিলবে না। কেননা আইন ঠিক করার প্রশ্ন এখানে জড়িত।
Civil disobedience ছাড়াও এখানে কিছু সাংবিধানিক অধিকার চর্চার বিষয় ছিল। বাকস্বাধীনতা, সমাবেশ, এবং সগঠিত হওয়ার অধিকার। সিভিল ডিজঅভিডিয়েন্স বা মহাত্মা গান্ধী ও মার্টিন লুথার কিংয়ের নন ভায়োলেন্ট এবং নন কোঅপারেশন মুভমেন্ট - সেসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সফল উদাহরণ ৭ই মার্চ। এই চরম উপায়ের রাজ-নৈতিকতার প্রশ্নের বাইরে বাংলাদেশে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক অধিকারগুলো কেমন আছে?
বাকস্বাধীনতা বা ফ্রিডম অব স্পিচের জন্য মানুষের যে Freedom from fear বা ভয়মুক্তির দরকার হয় – রাষ্ট্র কি মানুষকে সেই অভয় সংগীত শোনাতে পারছে? সমাবেশের অধিকার চর্চা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের বেআইনি অত্যাচার – পুলিশি হামলা – থেকে মানুষ কি নিরাপদ? বাংলাদেশ কি তার জনগণের সংগঠনের অধিকার চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করতে পারছে?

যদি না পারে তবে ৭ই মার্চ নিয়ে তামাশা করার ধৃষ্টতা আপনারা দেখায়েন না।

৭ই মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে। মার্চ ৬, ২০২১। নরমাল, ইলিনয়, যুক্তরাষ্ট্র।

Saturday, December 12, 2020

কচুরি পানা

 বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাংলাদেশে একটা আগাছা মুসিবত তৈরি করে। এর আগমন নিয়ে একাধিক গল্প আছে। প্রধান গল্পটা হচ্ছে নারায়নগঞ্জের পাট ব্যাবসায়ী অস্ট্রেলিয়া থেকে এটি বাংলায় এনেছেন। জন্মসূত্রে স্কটিশ অভিবাসী জর্জ মরগান এই আগাছাটির ফুলের সৌন্দর্য আর পাতার রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। আপনারাও এর ফুল পাতা দেখে মুগ্ধ হয়ে থাকেন। আগাছাটির নাম কচুরি পানা।


আরেক গল্প হচ্ছে ঊনিশ শতকের শেষে কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেনে এটি আনা হয়। সেখান থেকে কোন এক পানামুগ্ধ মানুষ সেটিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।

তৃতীয় গল্প হচ্ছে এটি আসাম থেকে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে গড়িয়ে ভেসে বাংলায় পড়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এই আগাছা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে জার্মান ষড়যন্ত্রও আবিষ্কার হয়েছে। ভারতীয় প্রজাদেরকে দুর্বল করার মাধ্যমে বৃটিশ রাজকে নাজেহাল করার জন্য জার্মানি এই পানা ছড়িয়ে দিয়েছে - এমন তত্ত্বও পাওয়া যায়। সে কারনে লোকেরা এর নাম দিয়েছিল জার্মান পানা। অন্য বর্ণনা হচ্ছে এক বহুজাতিক কম্পানি উদ্দেশ্য প্রণোধিতভাবে বাংলায় কচুরিপানা এনেছে।

কচুরিপানা মোটেও স্বস্তিদায়ক কোন অভিজ্ঞতা ছিলনা। যদিও আমরা কৃষি শিক্ষা বইয়ে এর সার বিষয়ক উপযোগিতার কথা জেনেছি তবে আমার বন্ধুর সাথে একবার বাজি ধরে হেরে গিয়েছিলাম। চারপাঁচটা বড় কচুরিপানা একসাথ করে সে বলল সে এগুলোর উপর দাঁড়াতে পারবে। হাটুর উপর শরীর ভিজবে না। (আমরা গ্রামের পোলাপান অল্প বয়সেই সাঁতার জানতাম। কাজেই ডুবে মরার ভয় ছিল না।) আমি ভাবলাম গভীর খালের পানি এইকয়টা পানার উপর সে ভাসতে পারবে কিন্ত কোমর পর্যন্ত ভিজবে নিশ্চয়ই। আমাকে অবাক এবং পরাজিত করে সে খালের পানিতে কচুরিপানার উপর দাঁড়ালো। একটাকা বাজিতে আমি হারলাম। সে পাওনা রইল। অবশ্য একটাকা দিতে হয় নাই। কারন সমপরিমাণ বাজিতে আমি জিতে গিয়েছিলাম।

(মাঝ পুকুরে ডুব দিয়ে পুকুরের তলার মাটি উঠানোর বাজি। আমার ভয় হয়েছিল দম বন্ধ হয়ে যায় কিনা, শিকলে টেনে ধরে কিনা। সেসব অতিক্রম করলে তুললাম মাটি। সেকি অনন্য জিত। ওরকম জিত না হলে এতদিন বাঁচতাম কেমন করে! আমার বন্ধু কচুরি পানাকে আমার চেয়ে ভাল চিনত। আমার বন্ধুকে অবশ্য আমি হারিয়ে ফেলেছি। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর, আর অক্ষর আক্রান্ত মানুষের সাথে মিশতে মিশতে আমার ভাষা কিছুটা বদলে যাওয়ায় কিংবা অন্য কোন অনাবিষ্কৃত সাধারণ কারনে আমার বন্ধু আমাকে ”আপনি” বলে অন্যরকম ভাবে বড় হয়ে যাওয়ায়... সুযোগ পেয়ে নিজের কথা আপনাদের শুনিয়ে দিলাম।)

কচুরি পানা ছুটতে পারে অসাধারণ। জলমাতৃক বাংলাদেশে স্রোত আর বাতাসের গতিতে ছুটতে পারার আনন্দ পেয়ে পেয়ে সারা দেশ দখল করল সে। কৃষি জমির এক বিরাট অংশ। নৌকার পালের মত পাতা আর জলের সাথে প্রায় ভাসমান শেকড় আর ওড়ার মত পাতলা শরীর - সবমিলে চেঙ্গিস খানের অশ্বারোহীদের মতন গতি পেল এই মুসিবত।

দেখতে সুন্দর এই আগাছা বাংলার জনপদকে নাজেহাল করে ছাড়ল। ফসলি জমির দখল নিয়ে ফসলের বারোটা বাজিয়ে দিল। ময়মনসিংহ খুলনা কুমিল্লা সহ দেশের বিভিন্ন বিলে ধান চাষ অসম্ভব হলো। বর্ষায় ভেসে ভেসে এসে জমিতে বসলে বর্ষার শেষে কচুরি পানার হাত থেকে জমি উদ্ধার করে চাষ করার শক্তি কই পাবে কৃষক! আর সেই শক্তি পেলেও পরের বর্ষায় আবার দখল নেয়ার জন্য জমিদারদের জমিতে বিনা পয়সার দলবাজ গুন্ডার মত রায়ত থাকত কিছু কচুরি পানা। কৃষক কিছু জমি পরিষ্কার করলেও সব জমি পরিষ্কার করা অসাধ্য। আর সামগ্রিকভাবে তাকে না ঠেকালে আবার দখল করার ক্ষমতা ছিল কচুরি পানার। কারন অন্যান্য গুনের পাশাপাশি সন্তান উৎপাদনের গতি ও ক্ষমতা অন্যান্য ফুল্ল-পত্রশোভিত উদ্ভিদের চেয়ে কচুরিপানার বেশিই ছিল।

বৃটিশ সরকার এই সমস্যাকে বিপ্লবী আন্দোলনের (বৃটিশরা যাদের সন্ত্রাসবাদী বলতো) বিপদের পরে সর্বোচ্চ আপদ হিসেবে বিবেচনা করেছিল। মহামারিতে ম্যালেরিয়া তুল্য এই পানা ম্যালেরিয়া ছড়ানোর মশার জন্য চমৎকার আবাস গড়ে তুলেছিল। শুধু ফসল উৎপাদনে ক্ষতি সীমিত না। ইকোলজির নষ্ট করেছে। জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে।

ফসল উৎপাদন কমাতে শুধু মানুষের খাবারেই নয়, গবাদি পশুর খাদ্যেও সংকট তৈরি হয়েছে। ধান চাষ বন্ধ হলে গরুর জন্য খড়বিচালিও বন্ধ। তারপর মহেশের গল্প। আপনারা জানেন সেটা। (এই গানও শুনতে পারেন চাইলে: https://bit.ly/2Hx5Kxn) খাবার হিসেবে গবাদি পশুর জন্য কচুরিপানা ক্ষতিকর। আমার যে বন্ধুর সাথে বাজিতে হেরে গিয়েছিলাম সে বন্ধু গরুকে খাওয়ানোর জন্য কচুরি পানা আনতো। নিয়মিত বা বেশি খাওয়ানো যায় না। গরু দুর্বল হয়ে পড়ে। খুব বিপদে না পড়লে কৃষক গরুকে কচুরি পানা খাওয়াতে রাজি হবেন না। কচুরিপানা খাওয়া গরুরা তখন দুর্বল হয়েছে। কচুরি পানা খেয়ে গরুর স্বাস্থ্য নষ্ট হয়েছে। অসুখ বিসুখ হয়েছে। কৃষকের জন্য যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা।

আমাদের দেশ নদীমাতৃক সে কথা আপনারা জানেন। এটা কম বলা হলো। জলমাতৃক বললে আরো ঠিক হয়। (তবে প্লাস্টিক আর বাণিজ্যিক আবর্জনা ফেলে বাংলার মাতা তথা নদীকে হত্যা ও দখলের চেষ্টায় কোন ত্রুটি কিংবা দায়িত্ব অবহেলা বা আন্তরিকতার ঘাটতি কোনটাই দেখায়নি কাণ্ডজ্ঞানে দরিদ্র-ফকিন্নিরা। বাংলা কেমন রাক্ষস জন্ম দেয় যে রাক্ষস নদীও হজম করে ফেলতে পারে। বাংলার রূপ কথায়ও এমন রাক্ষস নাই।) মশকরার চুড়ান্ত হচ্চে জলমাতৃক দেশের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে সড়ক পথকে পলিসিতে রাখা! অবশ্য বৃটিশ বাধ নির্মাণ ব্যবস্থা, রেললাইন তৈরি এই প্লাবনভূমির প্রতিবেশের বারোটা বাজানোর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের শুরু। এবং প্রতিবেশ বিরোধী রাষ্ট্রীয় জীবন ব্যবস্থা এখনো চলছে। অবশিষ্ট বনজলাশয় বৃটিশদের দেখানো পথে আরো ভয়ংকরভাবে ধ্বংস করার নাম রেখেছি আমরা উন্নয়ন।

বিশ শতকের শুরুর দশকগুলোতেও প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা নদী-নালা খাল-বিল ছিল। খাল-বিলে কচুরি পানা যোগাযোগ ব্যবস্থার নষ্ট করে দিয়েছিল। দল বাধা কচুরি পানা যোগাযোগ বন্ধ অথবা জলযানের গতি অনেক কমিয়ে দিয়েছিল।

ক্ষতি যত মারাত্মক হয়েছিল ততটা হতো না যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে জনগণের জন্য ঠিক সময়ে কৌশল নির্ধারণ করা হতো। কচুরিপানাকে নির্মূল করা হবে নাকি বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হবে এ ব্যাপারে দোলাচালের মধ্যে ছিল তখনকার রাষ্ট্র। ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত কচুরিপানা দূর না করে তা নিয়ে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট চালানো হয়েছে। পটাসিয়াম উৎপাদন কিংবা শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার কিংবা ছাই উৎপাদন ইত্যাদি নানা উপায়ে তা ব্যবহারের চিন্তা করা হয়েছে।

বাংলার জনগণের সাথে তামাশার বিরতি হয় ১৯৩৬ কচুরিপানা আইনের (Water Hyacinth Act 1936 shorturl.at/nCFUV) আওতায় নির্মূলের উদ্যোগ নেয়ার মাধ্যমে। অথচ একই উদ্দেশ্যে ১৯০৮ সালে কোচিন চায়নাতে (তখনকার ফরাসি কলোনি বর্তমান ভিয়েতনামের অংশ) এবং ১৯১৭ সালে বার্মাতে (তখন বৃটিশ কলোনি, এখন রোহিঙ্গা জেনোসাইডার রাষ্ট্র মায়ানমার) আইন তৈরি করা হয়। ১৯৩৭ এ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কচুরিপানা দূর করার এজেন্ডা যোগ হয়। ১৯৩৯ সালে উপনিবেশি রাষ্ট্র ও জনগণের যৌথউদ্যোগে কচুরিপানা সপ্তাহ পালন করে কচুরিপানার বিরুদ্ধে দুর্বার অভিযান চালায় বাঙালি। কিছুটা সাফল্যও আসে। কিন্তু কচুরিপানা আজো মীর জাফরদের মত রয়ে গেছে। যদিও কন্ট্রোলে আছে অনেকটা তবে বাংলা থেকে নির্মূল হয় নাই। আর নির্মূল হয় নাই বৃটিশ মানসিকতার রাষ্ট্রীয় নীতি। রাষ্ট্র চিরদিন জনগণকে উদ্যমী করার বদলে কচুরিপানা খাওয়া গবাদি পশুর মতন দুর্বল করে রাখে।
....
কচুরি পানা/১৭.০২.২০২০

[রেফারেন্স: কচুরি পানার ইতিহাস লিখেছেন ইফতেখার ইকবাল। “Fighting With a Weed: Water Hyacinth and the State in Colonial Bengal, c. 1910–1947” শিরোনামের লেখা: shorturl.at/fikOW । এই পোস্টের তথ্য উক্ত প্রবন্ধ থেকে নেয়া হয়েছে। আর সাথে বাংলাপিডিয়ার ছোট ভূক্তি shorturl.at/cxPX2 এবং ভেলাম ভ্যান শেন্ডেলের এ হিস্টরি অব বাংলাদেশ।

সতর্কতা: গবেষণাভিত্তিক তথ্য প্রমাণের স্টাইলে এই পোস্ট লেখা হয় নাই। আবেগের যথেষ্ট চিহ্ন আছে শব্দে বাক্যে। কত আর কচুরিপানা খাওয়া যায়। কচুরি ত নয়, এ যে কচুরি পানা।]

Tuesday, July 14, 2020

সাদা মন

এমন শ্যামল মেঘরঙা ভোরে,
কেন আমার কুসুমের কথা মনে পড়ে?

শৈশব থেকে অলি-গলি জনতার পথ পার হয়ে
কত ঘাস লতা পাতা মাটি ও পাথর হজম করেছে এই মন,
তবু মগজের গরু জাবর কাটতে কাটতে সেই দিনক্ষন ... ডেকে আনে ভোর এক সকালের ঘুমের ভেতর ... মাঝেমাঝে হেটে যায় সামান্য লালরঙা ফর্সা কুসুম৷

শিশুদের গ্রামীণ রাতে পেঁচারা সাতঘুটি খেলে আসমানে দাগ কষে নক্ষত্র ছড়িয়ে দিয়ে...
নক্ষত্রের আর কি কাজ, পেঁচার সাতঘুটি হওয়া ছাড়া!
হয়তো এখনো তাদের দাম আট আনার বুট ভাজা এবং কোকোলা লজেন্সের চেয়ে কম;
সপ্তর্ষির দাম গল্পের এক লাইন -
ঋষি নয়, ‘সাত বোন - তারকা হয়ে আসমানে হাসে' ...
অথবা জিকিরে রাতজেগে বড়পীর কিংবা শাহজালাল হতে চাওয়া মাউন ফকিরের ইশারা -
তারকা ধরে ধরে আঁকে নূহের কিশতি আর আদম সুরত৷

আমি কবিতা লিখতে চাই-
দাউদের সহিংস সব কবিতার পরে
আদম সুরতের কবিতা,
নূহের কিশতির কবিতা,
আদমের পুত্র কাবিলের কবিতা৷

ইউরোপের বরফের চাপে ঈসাও সাদা হয়ে যায়৷
তাই শতকে শতকে পৃথিবীতে গতিময় হয় আজ্রাঈলের প্রাণঘাতী পাখা৷
মুহম্মদকে ডাকা হয় ‘চকচকে সিন্ধুর তরবারি’!

অথচ আদমের সুরতে ছিল হাওয়ার প্রেম
নূহের নৌকায় ছিল প্রাণের সুরক্ষা
নাজারাতের দয়ালু নবি ঈসার চেহারা ছিল বাঙলার মতই শ্যামল ...

সবকিছু তলোয়ারে চেঁছে এবং সাদা ক্রিম মেখে আমাদেরে একাকার একঘেয়ে সাদানত করেছে পশ্চিমে উদয় হওয়া নিষ্ঠুর ফর্সা দুনিয়া!
তাই হাবিল আর কাবিলের গল্পে কেন কাবিল ফর্সা ছিল না? - সে কথা ইউরোপ জানে আর জানে লিভার ব্রাদার্স...

...

এই সকালে আমি কুসুমকে দেখি, এখনো ততটা সাদা, পুরুষের সমাজে যতটা টারজানের বোন৷

কি অদ্ভুত!
শৈশবে অনেকই পানকৌড়ির প্রেমে পড়ে,
জলের ভেতর ডুবসাঁতার দিয়ে সময় চোখ তোলে - ‘কবিদের পানকৌড়ি ভালবাসা সাদা স্বপ্নে মাংসের গন্ধে অন্ধ; তারা কখনো সৌন্দর্যের চোখ খোলে না!’

তাই দারুন মশলাদার কবিতার মত এখনো বহুজাতি-কম্পানিগণ
বিচিত্র পরের কাছে এমন সৌন্দর্য বেচে, যা শুধু তাদেরই বিষ-দন্ত-নখর ভরা সহিংস আপন৷

বাজার প্রভু, রেসালাত নয় প্রফিটের প্রফেট পাঠায়,
ভোগ-ধর্মে হেদায়াত পেয়ে দলে দলে কলমা পড়ে - ‘বাজার ছাড়া প্রভু নাই’ এবং আমরা সকলেই বিশুদ্ধ কনজ্যুমার ...

জিব্রাইল ক্লান্ত এবং ভীত; মুনাফার স্বর্গসুখ পেতে বিজ্ঞাপনী অহি আসে- সাদাই সুন্দর নয়; ফ্রেশ মানে সুন্দর ...

ভবিষ্যতে জিব্রাইল ফর্সা না হোক ফ্রেশতো হবেই...

কেন তবু কুসুমের কথা ‘মনে’ পড়ে?
হাজার বছরের বিষ্ঠায় গড়া ‘সাদা মন’ কিভাবে পরিষ্কার হবে?
ঠিক কোন অর্গানিক মন্ত্রে আমাদের ‘মন’ আর্য-আশরাফ-সাদা পশ্চিমকে অতিক্রম করবে?

_
(ডিসেম্বর ২০১৫/ এডিট: জুলাই ২০২০)

Tuesday, May 5, 2020

ছোট্ট সন্ধ্যা (অনুবাদ)

ছোট্ট সন্ধ্যা (مساء صغير)
মূল: মাহমুদ দারবিশ

অনুবাদ: লোকমান বিন নুর
_____

এক তুচ্ছ গ্রামে নামল ছোট্ট সন্ধ্যা
আর চোখ দুজন ছিল ঘুমন্ত

আমি রোমন্থন করলাম তিরিশটি বছর এবং পাঁচটি যুদ্ধ
এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এই সময়
আমার জন্য লুকিয়ে রেখেছে একটি গমের শীষ

গায়ক গাইছে
অগ্নি এবং অপরিচিতদের গান

আর সন্ধ্যা ছিল অন্ধকার
এবং গান গাইছিল গায়ক

এবং তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে -
“তুমি কেন গাইছ?”
সে তাদের জবাব দিল-
“কারন আমি গাই”

এবং তারা তার বক্ষ তল্লাশি করলো
অতঃপর সেখানে তাঁর হৃদয় ছাড়া আর কিছুই পেলো না

এবং তারা তার হৃদয় তল্লাশি করলো
অতঃপর সেখানে তার আপনজন ছাড়া আর কিছুই পেলো না

এবং তারা তার কণ্ঠস্বর তল্লাশি করলো
অতঃপর সেখানে তার দুঃখ ছাড়া আর কিছুই পেলো না

এবং তারা তার দুঃখসমূহ তল্লাশি করলো
অতঃপর তারা কারাগার ছাড়া আর কিছুই পেলো না

এবং তারা সেই কারাগার তল্লাশি করলো
অতঃপর তারা কারাগারের ভেতর নিজেদের ছাড়া আর কিছুই পেলো না

আর সন্ধ্যা ছিল অন্ধকার
এবং গান গাইছিল গায়ক
-

অনুবাদ - ২৯/০২/২০২০

শেড অ্যাকুরিয়াম

মে ৮, ২০২২ শেড অ্যাকুরিয়াম গেলাম। সকালে উঠলাম দেরিতে। দায়ীন ভাইয়ের সাথে কথা বলেছিলাম গতকাল। তিনি ছিলেন শেড এর কাছাকাছি। তার আরেক বন্ধুর সাথে...