ঊনিশ শতকের মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্ট (১৮৭৪ - ১৯৬৩) এক তুষার ঝরা সন্ধ্যায় থেমেছেন এক অপরিচিত বনের পাশে। মনোরম, ঘন এবং গভীর এক বনের সৌন্দর্যে থমকে থাকার তুষার সন্ধ্যা। সৌন্দর্য হন্তারক। সুন্দরের আশ্চর্য মারবার ক্ষমতা আছে। বিস্ময়ে আন্দোলিত কবি যেমন বলে ওঠেন - মরি হায় হায়রে! বছরের সবচে অন্ধকার সন্ধ্যার যে রূপে কোন মানুষের আনন্দে মরে যেতে ইচ্ছে করতে পারে রবার্ট ফ্রস্ট তেমন সুন্দরের সেই প্রলোভনকে পিছনে ফেলে ‘বুদ্ধি’র ডাকে সাড়া দিয়েছেন।
“The woods are lovely, dark and deep,
But I have promises to keep,
And miles to go before I sleep,
And miles to go before I sleep.”
ফ্রস্ট নয়, ফ্রস্টের কবিতার এক অশ্বারোহীর কথা। যদিও মরিবার মত সুন্দর এক ঘন, গভীর, প্রেয়সী বনের তুষার রাত্রি দেখা দিয়ে গেল। এমন রাত্রে মনে হতে পারে “সাধ ছিল মরে যাব তরুণ বয়সে/ যেদিন আকাশ ব্যেপে ফুল্ল চন্দ্রলোক/ ছড়াবে মধুর হাসি, ভ্রমরের অপূর্ব ঝঙ্কার/ জেগে রবে ফুটি ফুটি চম্পকের বনে, জাগাবে/ বুকের তলে করুণ বেদনা।” তেমন এক রাতে অভ্যস্ত জীবন ছেড়ে “অন্তরে যে বাঁশি বাজে তার সুর ধরে/ একাকী গমিত হব নক্ষত্রের পথে/ দেবতার পুত্র আমি এখানে কি কাজে আছি।” (ছফা: ২০১০)। মরে যাওয়ার মত সুন্দর এই রাত্রে নক্ষত্রের পথে উড়েনি সে পথিক। নিজেকে জাগিয়েছে আরো গভীরভাবে - জীবনের সাথে ওয়াদা রাখতে হবে আর ঘুমের আগেই যেতে হবে আরো অনেক দূর। হয়তো বুদ্ধির ডাক নয়, আরো গভীর কোন সুন্দরের নাম। ঘন, গভীর, প্রেয়সী বনের চেয়ে সুন্দর জীবনের প্রতিশ্রুতি। আরো কিছু পথ পেরোলেই যেখানে যায় ফ্রস্টের অশ্বারোহী।
১৯২২ সালের দিকে ফ্রস্ট যখন এই কবিতা (Stopping by Woods on a Snowy Evening) লেখেন তখন মানুষেরা ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে মোটর গাড়িতে উঠতে শুরু করেছে। ঊনিশ শতকের শেষ দিকে একটা দুইটা দিয়ে শুরু হয়ে মোটরে চড়া মানুষ ১৯১০ এর দশকে বাংলার রাস্তায় ছুটতে শুরু করে।
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) এর জীবনে ‘ঊনিশ শো চৌত্রিশের’ “একটা মোটরকার খটকা নিয়ে আসে।” কবি বলছেন ঊনিশ শো চৌত্রিশের মডেলের একটা মোটরকার ঝকমক করছে, ছুটছে লাল সুরকির রাস্তায়। যদিও ‘এই মোটর অগ্রদূত, সে ছুটে চলছে যেই পথে সকলের যাওয়া উচিত’, তবুও তার কাছে মোটর কার সব-সময়েই খটকা এবং অন্ধকারের মতো মনে হয়েছে। বিস্ময় কিংবা খটকালাগা কবি জানাচ্ছেন ‘রাতের অন্ধকারে হাজার হাজার কার হু হু ক’রে ছুটছে/ প্যারিসে - নিউইয়র্কে - লন্ডনে - বার্লিনে - ভিয়েনায় - কলকাতায়’। মোটরকার ছুটে চলছে ‘মানুষ-মানুষীর অবিরাম সংকল্প ও আয়োজনের অজস্র আলেয়ার মতো’।
তিনি তবু ছুটতে চান না, রবার্ট ফ্রস্টের অশ্বারোহীর মতো। বরং তার জীবনের হিসাব ঠিক উল্টো:
“আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;
আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।
জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা
অন্য সবাই এসে বহন করুক: আমি প্রয়োজন বোধ করি না :
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।”
জীবনানন্দ কিংবা রবার্ট ফ্রস্টের অশ্বারোহী - কেউ ঘুমাতে যেতে চায় না এখানে। ‘মড়ার কবর ছেড়ে পৃথিবীর দিকে ছুটে গেল’ তাদের মন। নগরের রাস্তার আলোতে কিংবা তুষার শাদা বনের অন্ধকারে কেউ থেমে নেই। কেউ হাটছে নক্ষত্রের কণা বুকে নিয়ে, কেউ ছুটছে সংকল্পের খুরে ভর দিয়ে।
বুদ্ধিমান মানুষ জীবনের অবিরাম সংকল্প, মোটর কারের মত ছুটে চলা জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতা, অথবা নক্ষত্রের নিচে হাঁটতে থাকা এক পথিক জীবন - জানিনা কে বেশি সুন্দর। সবাই দাঁড়িয়ে আছে সবুজ সড়কে!
-
সূত্র:
১. Stopping by Woods on a Snowy Evening, রবার্ট ফ্রস্ট
২. সাধ, আহমদ ছফা। আহমদ ছফার কবিতা সমগ্র, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১০।
৩. উনিশশ চৌত্রিশের, জীবনানন্দ দাশ। প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র, অবসর: ১৯৯৪/ ১৫শ মূদ্রণ: ২০১৬)। জীবন, ধূসর পাণ্ডুলিপি, জীবনাননন্দ দাশ।
৪. http://www.kolkataonwheels.com/the-first-car/
--
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International License.
No comments:
Post a Comment