Friday, July 9, 2021

পাগলা ডুমুর ১

দাদা ভান্তে একদা আরেক সাধু সহ সফর শুরু করেছিলেন। সাধু তপস্বী জীবন, চর্চার মধ্যেই প্রকাশ পায়। সফর চলতে থাকে। কামনা বাসনা থেকে মুক্তির পথে নারীসঙ্গ বড় বিপদজনক বাসনার উৎস। মুনিদের ধ্যান ভাঙার জন্য নারীদের নাম বদনাম দুইই শোনা যায়। ‍কিশোর বয়সে এক তুর্কি দরবেশের কথা বেশ তাজ্জব করেছিল; তুর্কি দরবেশ বলেছিলেন, একটা দেশলাইয়ের কাঠি যেমন রোম, টোকিও, কিংবা লন্ডন পুড়িয়ে ফেলতে পারে, একজন নারীর এক পলক চাহনি এক হাজার বছরের ইবাদত বন্দেগী তেমন ছাই করে দিতে পারে। রোম আবার গড়া যায়, কাগজের টোকিও সিমেন্টে পাথরে বিস্তর হয়ে উঠতে পারে, লন্ডনও রয়াল সোসাইটির প্লানে আরো ঝাকুম-ঝুকুম কসমোপলিটান হয় — তবে এক জীবনের ইবাদত বন্দেগী পুনরায় ঠিকঠাক করার চান্স শূন্যের কাছাকাছি। তাই প্রেম বা প্রেমাধিক আকাংখ্যার ভয় মুনিঋষিরা চিরদিন সাধনার পথে ঝুলিয়ে রেখেছেন।

এক্ষনে যে দাদা ভান্তে আর তার সাগরেদের কথা কহিলাম তিনিও ব্যতিক্রম নন। তাহাদের যাত্রা পথে একটি একহাটু জল কিন্তু হাটু কাঁপানো স্রোতের নদীর দেখা মিলিল। নদীর পাড়ে সাজসজ্জায় রূপ বাড়াইয়া এক রুপবতী নারী অপেক্ষমান। মুনিঋষিদের যাত্রা পথে বিপদ একলাই আসে। ভ্রার্তৃ-পুত্র-পিত কেহ সহায় হইয়া থাকে না। যদিও এখনকার সচেতন সাহিত্যে কিশোরী তরুণী সকলেই অন্তত প্রিয়ংবদা সহযোগে শকুন্তলার মত গল্প উপন্যাসে বিচরণ করেন। যাহোক, হাটু কাঁপানো স্রোতস্বিনী পার হইবার সাহস যদি রুপসীর থাকিত তবে প্রজ্ঞার ঈশ্বর তাকে দাদা ভান্তের কাধে চড়াইত না। রূপসীকে দাদা ভান্তে কাধে চড়াইয়া —বর্ষাকালের বাঙালি জামাইরা যেমন নতুন বউকে উদ্ধার করেন, সেইমতন— নদী পাড় করাইয়া দিলেন।

পুনরায় পথ চলিতে লাগিলেন তারা। শিষ্য কিছুতেই আহত বাকবুদ্ধিকে সুস্থ করিতে পারিল না। বারবার দাদা ভান্তেকে জিজ্ঞাসা করিল আপনি এই কাজ কেন করিলেন। সাধনার পথে এমন কর্ম হইতে দূরে থাকিবার নিয়ম। রূপবতী শুধু দেখিলে না হয় অল্প বলিয়া ছাড় দেয়া যাইত; আপনি ত শুধু দেখেন নাই, ছুঁইয়াছেন। শুধু স্পর্শ করিয়াছেন বলিলে আমার কাতরতা শেষ হয় না, আপনি তাহাকে কাধে লইয়াছেন। তাও যদি কাধে লইয়াই আপনার ভুল বুঝিতে পারিয়া সাথে সাথে নামাইয়া রাখিতেন, তাতেও আমার ‍গুরুভক্তি রক্ষা পাওয়ার একটা সম্ভাবনা ছিল। আপনি এক অপরিচিত রূপবতী নারীকে কাধে চড়াইয়া নদী পার করিয়া দিয়াছেন। সদাশয় গুরু ভান্তে, আপনার প্রতি আমার ভক্তির উষ্ণতার ভেতর স্রোতস্বিনীর শীতল জল না ঢালিয়া দিলে আজ আমার তপস্বার অগ্রগতি এমন করিয়া নদীতীরে আছাড় খাইত না।

দাদা ভান্তে চুপ থাকিয়া যাত্রাপথ অতিক্রম করিতেছিলেন। কয়েকমাইল হাঁটার পর দিনান্তের বিশ্রামের জন্য তিনি থামিলেন। শিষ্য দাদা ভান্তেকে এই রুপবতীকে স্কন্ধদান বিষয়ে প্রশ্নে কটাক্ষে ত্যক্তবিরক্ত করিবার চেষ্টা হইতে বিশ্রাম লাভের কোন লক্ষ্যণ দেখাইল না। অতঃপর দাদা ভান্তে মুখ খুলিলেন। বলিলেন, আমি তো তরুনীকে নদীর পাড়ে রাখিয়া আসিয়াছি, তুমি এখনো তাহাকে বহিয়া বেড়াও কেন?
-

দাদা ভান্তের সাথে আমরা শিষ্য মারফত আর কোন আলাপ যাতে করিতে না পারি প্রজ্ঞার ঈশ্বর সেই ব্যবস্থা করিয়াছেন গল্প শেষ করিয়া। তবুও আমরা আমাদের জীবনে বহু বোঝা বহিয়া বেড়াই, জীবন কুঁজো হয়ে যায় সটান দেহ আর শ্যাম্পুকরা চুলের নিচে মগজের ভেতর।

Thursday, July 1, 2021

আহমদ ছফার বাসনা

 আহমদ ছফার চিন্তার বৈপরিত্য খুঁজে পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু চিন্তার বৈপরিত্য বা কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে কি যুক্তি দিয়েছেন তার চেয়ে বড় ছফার বাসনা। ছফার বাসনার কারনেই ছফা গুরুত্বপূর্ণ। ছফার বাসনা কি ছিল?

একটা স্বাধীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। এমন একটা জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র পাওয়ার গল্প তিনি বলেছেন যে, জনগোষ্ঠী এই ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ সবই বদলে দেবে। দিয়েছে। উপমহাদেশের ইতিহাসে এখনো বাংলাদেশের এই উত্থানের প্রভাব লেখা হয়নি। আর বাংলাদেশের সম্ভাবনা দেখার মতন স্থিরতা আমাদের কপালে জুটেনি।
ছফা জানাচ্ছেন জাতি রাষ্ট্র হিসেবে এই অঞ্চলে পাকিস্তান এবং ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে আধুনিক রাষ্ট্র। ভারত এবং পাকিস্তানের একজাতি বা দ্বিজাতি দুটিই যে মিথ্যা কথা - তা বুঝা যায় বাংলাদেশের রাষ্ট্র হওয়ার মধ্য দিয়ে। কারন এই অঞ্চল বহুজাতির। এক ভারতীয় বা দুই হিন্দু-মুসলিম জাতির মাত্র নয়।
সেক্যুলার বাঙালি মুসলমানের দরবেশ ছিলেন আহমদ ছফা। তার দরবেশ সুলভ জীবনের কারনে তাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হইতে থাকে। অন্য অনেকেই হয়তো ছফার মতো জাগ্রত বাংলাদেশের বাসনা বুকে নিয়ে জীবন কাটাইছেন কিন্তু ছফা ঘর সংসার চাকরি বাকরি করেন নাই বলে তাকে আর কোন পরিচয়ে আড়াল করা যায় নাই।
-
/জুন ৩০, ২০২১

Wednesday, June 30, 2021

প্রলাপ

ইদানিং মুশকিল হচ্ছে। আগেও হতো মাঝে মাঝে।
বাঙালি চেহারা ফেসবুকের বাইরে খুব কম দেখি। তাতে মানুষগুলো কল্পনায় হাটাচলা শুরু করে। হয়তো পুরাতন ইটের রাস্তার ছবি দেখলাম, তাতে দূর্বাঘাসও দেখা হয়ে যায়। কল্পনার মানুষদের কথাবার্তা শোনার আগেই মাথা টনটন করে।
হলদে রঙের রাবার ব্যান্ড পরা কন্যার চুলের ঝুটি আমার কল্পনায় নড়তে শুরু করে। সংলাপহীন এই জ্যন্ত সব কল্পনারা মাথা খারাপ করে দিচ্ছে।
অন্তত ফেসবুকে বাঙালীর গভীর বেদনাভরা মুখের উপস্থিতি কম। রাস্তায় রাস্তায় দেখা হওয়া করুন মুখেরা এখনো ডিজিটাল ডিভাইডের অপর পাশে বেশি মনে হয়।
আপন দুঃখ পরকে দেখাব না বলে আমাদের দুঃখের মুহুর্তরা এখানে এই ভার্চুয়াল গঙায় ভাসে না।
যাদের কপাল বড় হতে হতে মাথার মাঝে চলে গিয়েছে, অথবা যাদের কপাল ঢেকে গেছে বেয়াড়া চুলে, যাদের চোখ খুশিতে ছোট হয়ে হাসছে, অথবা পৃথিবীর সামনে যাদের চোখে শান্তি ও স্থিরতা সাজানো সব বাঙালি চোখ ও কপাল কথা বলছে।
তাদের দেখে ফেসবুক আমাকে পরামর্শ দিচ্ছে তুমি হয়তো এদেরকে চেনো। আমার মনে হয় সবাই পরিচিত। তবু চিনতে পারি না। অনেকেই হয়তো কোন এক রোদে একই গাছের ছায়া দেখেছিলাম। অন্তত একই মেঘের বিভিন্ন ছায়ায় ছিলাম আমরা।
একই শীতে ভিন্ন রঙের উলের জামা পরেছি আমরা, একই গান শুনেছি ভিন্ন কোন দিনে, একই রঙের ফুল ভিন্ন ভিন্ন তীব্রতায় দেখেছি।
প্রলাপ/
জুন ২৯, ২০২১

Thursday, June 24, 2021

ক্লান্ত ইউনিকর্ন



তোমার ঘ্রাণ পেতে ব্যাকুল হয়ে ছিলাম বহুকাল।

যারা বৃক্ষের মতন স্থির
অপেক্ষায় তাদের শেকড় গজায়,
হয়তো তাদের ভোতা খুড়ে লুকানো থাকে অদৃশ্য শেকড়…
বৃক্ষের তপস্যা আমার হৃদয়ে নেই।
আমি সময় ভাঙি অনন্ত সময়ের দিকে চেয়ে
যেখানে উড়ে যায় নক্ষত্র অথবা ধ্রুবনক্ষত্রের স্বর –
অসংখ্য চন্দ্রগ্রস্থ রাতে
নির্লীপ্ত জোৎস্নাগলা নিঃসঙ্গতায়
ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে
নক্ষত্রের পানে তাক করা আমার কপালে গজিয়েছে একটি শিং
প্রতিটি একান্ত আলো-আধারির ক্ষণে
আমার আর হাত থাকে না
বাতাস কিংবা জোৎস্না ছুঁয়ে দেখার
আমার চোখে বাতাস লাগে
নাকে চাঁদের ঘ্রাণ
ঠোট শুধু কাঁপতে থাকে
তোমার জড়তার মত
অপেক্ষা অসংখ্য সবুজ ঘাস শুকনো খড়ের গাদা
তুমি অথবা প্রেম এক লুকানো সুঁই
আমার শ্বাস প্রশ্বাসের সুতারা যেন জানে কোথায় খুঁজতে হবে হবে তোমায়
অতঃপর অপেক্ষার ঘাসের মাঠে খুঁজতে খুঁজতে
তোমার ছায়া
আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হই এবং দাঁড়িয়ে থাকি অলৌকিক অশ্বের মত
শুনেছি ইতিহাসের শৈশবে সিন্ধু নদীর পাড়ে
তোমার ঘর ছিল
ঢেউয়ে ঢেউয়ে দুলতে থাকা
গাঢ় অন্ধকারে
ফসলের সুখ পেরিয়ে
ডুমুর গাছের ছায়া
তোমাকে বসতে দিত
মায়ার হৃদয় পেতে
(হয়তো সেও অপেক্ষায় ছিল তোমার!)
শিকারী সমাজ যারা পোষে পালোয়ান
আমাকে বধ্য ভেবে ছুঁড়ে তীর হানে বর্শা পাতে ফাঁদ
তীক্ষ্ম ঈর্ষা, তীব্র ঘৃণা, গহন উপেক্ষায়
বধ করতে চায় তারা নিরন্তর;
তোমার প্রেম বা প্রেমাধিক প্রেম
আমায় ভুলিয়ে রাখে
প্রেমের ভিতর।
-
জুন ২৩, ২০২১
Image: Kitiara, 2018 / www.goodfon.com

Sunday, June 20, 2021

খড়ি মোল্লাদের মাসনা সুলাসা

ইদানিং কিছু ফাতরা টাইপের মোল্লার উদয় হয়েছে। এরা ইসলাম সম্পর্কে দুয়েক পাতা পড়লেও কাণ্ডজ্ঞানের দিক থেকে বেক্কল। এদের কাঠমোল্লাও বলা যাবে না, খড়ি মোল্লা বলা যেতে পারে বড় জোর। এরা মাসনা সুলাসার আলাপ করে বেড়ায়। এদের ইসলাম সম্পর্কে বুঝ কম, কাণ্ডজ্ঞানও খারাপ।

কোরআনের বিবাহ সংক্রান্ত আয়াতে ‘আমর’ বা আদেশসূচক ক্রিয়াপদ ব্যবহার করা হলেও তা আবশ্যক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। অধিকাংশ আলেম বিয়ে ফরজ হওয়ার বিষয়কে শর্ত সাপেক্ষ মনে করেন। বিয়ে ফরজ হওয়ার নিয়ম আর্থিক সক্ষমতা থাকার পর শারীরিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার উপর নির্ভরশীল। কারো শারীরিক চাহিদা আছে, কিন্তু পয়সা নাই – তার জন্য পরামর্শ হলো রোজা রাখা। (এখন রোজা না রেখে শারীরিক চাহিদা বাড়ায় এমন খাবার বর্জন করার মাধ্যমেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।) মজার বিষয় হচ্ছে – এই একই পরামর্শ বাংলাদেশে উতলা হয়ে যাওয়া কিছু ফাতরা মোসলমান পুরুষদের বেশি বেশি শোনা উচিত। তাদের যদি মনে হয় শরীর তাদের খুব উৎপাত করছে, তাদের উচিত রোজা রাখার মত মহতী ইবাদতে মশগুল থাকা। উত্তেজক খাবার না খাওয়া। সমাজে ফাতরামি ছড়ানোর দরকার নেই।

একাধিক বিয়ের বিষয়টি ব্যতিক্রমি নিয়ম। সাধারণ নিয়ম নয়। কেউ যদি বিয়ে করতে না চায়, তাও একটি ব্যতিক্রমি বিষয়।

এক স্ত্রী বিদ্যমান থাকা অবস্থায় দ্বিতীয়/তৃতীয়/চতুর্থ বিয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনে বাধা নেই। পুরুষের জন্য বহুবিবাহ নিষিদ্ধ নয়। তবে বিবাহিত থাকা অবস্থায় আরো বিয়ে করতে চাইলে আইনগত পদ্ধতি ও শর্ত মানতে হবে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনগত পদ্ধতি ও শর্তগুলো শরীয়ার কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন এবং সুষম ব্যাখ্যা বলা চলে। কোরআনের সাবধান বাণী ‘আর যদি তোমরা ভয় পাও যে তোমরা ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে পারবে না’—র আইনি রূপ পাওয়া যায় এসব শর্ত ও পদ্ধতিতে।

শর্তগুলো কি?

১. সালিশের মাধ্যমে এমন বিয়ের অনুমতি পেতে হবে। কেউ যদি মনে করে বিবাহিত অবস্থায় তার আরো বিয়ে করা প্রয়োজন – এই সিদ্ধান্ত সে নিজে নিলে তার পক্ষপাতমূলক বা বায়াসড হওয়ার ঝুঁকি আছে। এছাড়া বর্তমান স্ত্রীর স্বার্থ জড়িত থাকায় তার প্রতিনিধিত্ব ছাড়া সিদ্ধান্ত ন্যায্য হতে পারে না। তাই সালিশ গঠিত হবে স্বামীর প্রতিনিধি, বর্তমান স্ত্রীর প্রতিনিধি নিয়ে। এই সালিশ যদি যৌক্তিক এবং প্রয়োজনীয় মনে করে তবে কারণ উল্লেখপূর্বক এবং যদি কোন পক্ষের কোন যৌক্তিক শর্ত থাকে সেই শর্ত সাপেক্ষে এমন বিয়ের অনুমতি দিতে পারে।

সালিশের সিদ্ধান্তে যদি কেউ সন্তুষ্ট না হয় তবে সে আদালতের কাছে যেতে পারে। এক্ষেত্রে আদালতের সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

২. প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিদ্যমান স্ত্রী/স্ত্রীগণের অনুমতি। তাদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবে না।

শর্ত লঙ্ঘন করলে তাকে দুটি পরিণতি ফেইস করতে হবে – প্রথমত, তৎক্ষণাৎ স্ত্রীর দেন মোহর সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে; দ্বিতীয়ত, এক বছর কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় ধরনের শাস্তি পেতে হবে।


মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, ধারা ৬

বহুবিবাহ:

১) কোন ব্যক্তি বিবাহিত অবস্থায় সালিশী কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া আর বিয়ে করতে পারবে না; বা এধরনের অনুমতি ছাড়া কোন বিয়ে ১৯৭৪ সনের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন এর অধীনে নিবন্ধিত হবে না।

২) ১নং উপধারা অনুযায়ী অনুমতির জন্য নির্ধারিত ফিস-সহ চেয়ারম্যানের কাছে দরখাস্ত করতে হবে; এবং তাতে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ এবং এ বিয়ের ব্যাপারে বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের সম্মতি নেয়া হয়েছে কিনা তা উল্লেখ থাকবে।

৩) ২নং উপধারা অনুযায়ী দরখাস্ত পাওয়ার পর চেয়ারম্যান দরখাস্তকাী ও বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগণের প্রত্যককে একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলবেন। (প্রতিনিধিদের নিয়ে) গঠিত সালিসী কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিয়ে প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত মনে করলে যৌক্তিক শর্ত থাকলে তা সাপেক্ষে দরখাস্ত মঞ্জুর করতে পারেন।

৪) দরখাস্তের বিষয় নিষ্পত্তি করার ক্ষেত্রে সালিশী কাউন্সিল কারন উল্লেখ করবেন; নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যে কোন পক্ষ নির্দিষ্ট ফিস দিয়ে নির্দিষ্ট দফতরে সহকারী জজের নিকট রিভিশনের জন্য আবেদন করতে পারে; এ বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত বিবেচিত হবে এবং কোন আদালতে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

৫) কোন ব্যক্তি যদি সালিশী কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া অন্য বিয়ে করে তবে সে-

ক) বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীগনের তলবী ও স্থগিত দেনমোহর সম্পূর্ণ তৎক্ষনাৎ পরিশোধ করবে। দেনমোহর পরিশোধ না করলে তা বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হবে; এবং

খ) অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।


এই আইন ভাল না খারাপ সেই মোরালিস্ট আলোচনা এখানে করতে চাই না। তবে খড়ি মোল্লাদের যদি জিজ্ঞেস করেন, ইসলামে কি নারীদের দাসী হিসেবে রাখার বৈধতা আছে কিনা? তারা তখন আইসিসের মতন যৌনদাসী খুঁজতে কিতালের জন্য বেড়িয়ে পড়তে পারে।

Friday, March 12, 2021

টর্চার, শিক্ষা, ও সেক্যুলারিজম

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ (BLAST and ASK versus Bangladesh, Writ Petition No.5684/2010) ২০১১ সালের শুরুতে রায় দিয়েছিল। রায়ের প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালা প্রণয়ন করেছে একই বছর।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি বাংলাদেশের অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান বাদে সর্বত্র ছিল। রায়ের ১০ বছর পার হয়েছে। ১০ বছরে অগ্রগতি ভাল বলা যায়। আশা করা যায় ২০৩০ এর দিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের টর্চারের মানসিকতা থাকবে না।
যদিও টর্চার যে নিষেধ এই কথা আমার স্টুডেন্টদেরকে বুঝাতে কষ্ট হয়েছে। বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে টর্চার বিদায় করার জন্য যে নৈতিক সাপোর্ট পরিবার এবং রাষ্ট্র থেকে আসবে – সেই পরিবার এবং রাষ্ট্র টর্চার জারি রাখলে তা হবে না। পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে টর্চারমুক্ত করার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের টর্চার বন্ধ করতে হবে। কারন যে মৌলিক অধিকার (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫ এবং অন্যান্য) প্রয়োগের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি (টর্চার) নিষিদ্ধ সেই মৌলিক অধিকার রাষ্ট্র তার আইন শৃংখ্যলা বাহিনীর মাধ্যমে লঙ্ঘন করতে পারে না।
উল্লেখ্য, যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক মানসিক শাস্তি বন্ধ করা হয়, তখন ক্বওমী মাদরাসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল না। মাদরাসা (আলিম পর্যন্ত) এবং অন্যান্য সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ থাকলেও মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় ক্বওমী মাদরাসার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। যদিও ‘অন্যান্য সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ বলতে ক্বওমী মাদরাসাকেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়; এবং সে হিসেবে ক্বওমী মাদরাসা উক্ত নীতিমালার বাইরে নয়।
২০১০ এর দশকে বাংলাদেশে তথ্যের গতি বেড়েছে ইন্টারনেটের কারনে। তাতে এই ধরনের টর্চারসহ আরো সব ডেভিয়েন্সের খবর আমরা জানতে পারছি। ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া সমাজের এবং রাষ্ট্রের ছবি দেখায়ে দিচ্ছে খুব সহজেই। ২০১১ সালের এই ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বাড়লেও ক্বওমী মাদরাসায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের পরিমান বেড়েছে সম্ভবত অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরে। তথ্য প্রযুক্তির সাথে সমাজের এই পরিবর্তনের সংযোগ আছে। সমাজে যে ডিজিটাল ডিভাইড বিরাজমান তা আরো বড়সড় অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাচ্চা। এই বৈষম্যের নানান রকম প্রকাশের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি।
এছাড়া বাঙালি মোসলমান এখনো বিদ্যা বিতরনে কৃপণ। বিশেষত আধুনিক শিক্ষিত কিংবা সেক্যুলার বাঙালি শিক্ষা বিস্তারে ততটা আগ্রহী বা সফল নয়। শিক্ষার ভার পীর সাহেব আর দুনিয়াদারির খোঁজ না রাখা মাওলানা-মৌলবিদের হাতে দিয়ে মানুষের সুন্দর দুনিয়াবি জীবন হবে না। আপনারা সেক্যুলারিজমকে শুধু মন্ত্র হিসেবে বিশ্বাস করলে অন্যের ইহকাল ভাল হবে না। অন্তত সকলের ইহকাল বা দুনিয়ার জীবনকে সহজ সুন্দর করে তোলার চেষ্টা না থাকলে আপনি বরং সেক্যুলারিজমকে এন্টিরিলিজিয়াস এক্সট্রিমিজিম থেকে মুক্ত করতে পারবেন না। বাংলাদেশে সেক্যুলারিজমের এই স্ববিরোধী হয়ে উঠার দায় পুরাটা নন-সেক্যুলারদের নয়, সেক্যুলারিজমের সমর্থকদেরও।
গত কয়েকবছরে অনেকেই দরদী হয়ে উঠছেন। অন্তত ক্বওমী মাদরাসায় পড়ুয়া শিশুদের নিজেদের শিশু হিসেবে ভাবতে পারছেন অনেকে। আরো বেশি দরদী হয়ে উঠলে এই সমাজে ধর্মের সত্যিকার পর্যালোচনা সম্ভব হবে।
টর্চার, শিক্ষা, সেক্যুলারিজম। মার্চ ১১, ২০২১/ নরমাল, ইলিনয়

৭ই মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ রেটরিকে আগ্রহী যে কারো কাছে একটি অসাধারণ এবং সফল ভাষণ। রেটরিকের যে তাৎক্ষণিক প্রভাব একজন ওরেটর বা বক্তার আকাঙ্ক্ষিত থাকে এই ভাষণের মাধ্যমে তা অর্জিত হয়েছে।

কিন্তু ৭ই মার্চের ভাষণ শুধু রেটরিক বা নান্দনিক এক ভাষণে সীমাবদ্ধ নয়। ভাষণের সৌন্দর্য বর্ণনা করে নির্মলেন্দু গুণ তার সেরা একটি কবিতা রচনা করেছেন, ভাষণের ব্যকরণ বিচার করে এর প্রশংসা লিখেছেন আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
এছাড়া এই ভাষণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় এর নাম উঠেছে। তবে এই ভাষণের সংরক্ষণে বাংলাদেশের দুর্বলতা লজ্জাজনক। ভাষণের একাধিক ভার্সন আছে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। রাষ্ট্রের আইসিটি ডিভিশনের প্রচারিত রেকর্ড, ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্ম এন্ড পাবলিকেশন্স এর প্রচারিত রেকর্ড, এবং সংবিধানে সংযুক্ত ভাষণের লিখিত রূপ – এ তিনটি রেকর্ডে সামঞ্জস্য নেই। তাছাড়া সম্পূর্ণ ভাষণটি কোথাও পাওয়া যায় না। ভাষণটি কত মিনিট লম্বা ছিল তা নিয়ে একাধিক মতামত আছে। রেকর্ড সংরক্ষণের দুর্বলতা তথা ইফিসিয়েন্সির ঘাটতি ছাড়াও বাঙালি কালচারে রেকর্ড সংরক্ষণে সততার ঘাটতিও প্রকট। রাজনৈতিক দলগুলো এ ব্যাপারে খুবই অদক্ষ। (মুক্তিযুদ্ধে যারা নিহত হয়েছেন তাদের কোন পূর্ণাঙ্গ তালিকা না থাকা রেকর্ড সংরক্ষণে ব্যর্থতার বড় প্রমাণ। হিটলারের জার্মানির রেকর্ড সংরক্ষণের দক্ষতার কারনে হলোকাস্টের ভয়াবহতা জানা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে শিখেছে গুম। আর তথ্যগুম শিখেছে বৃটিশ শাসনের অফিসিয়াল সিক্রেসি আইন থেকে।) ৭ই মার্চের ভাষণটিকে কাঁটাছেড়া করা এবং তার পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড না রাখার ব্যর্থতা প্রথমত আওয়ামী লীগের। যেহেতু বাংলাদেশের মানুষের চিন্তাজগত ইতিহাসকে দেবতা ও দানবে বিভাজিত আকারে দেখায় প্রভাবিত – তাই ইতিহাস কাঁটাছেড়া করার মত নির্লজ্জ, হীন, অপমানজনক এক আচরণ এখানে টিকে আছে।
ভাষণের রেটরিক হিসেবে সাফল্য, সৌন্দর্য, স্বীকৃতি, এবং রেকর্ড সংক্রান্ত ব্যর্থতা ছাড়াও এর রাজনৈতিক মূল্য আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের জন্য আওয়ামী লীগের প্রস্তুতিহীনতার যে কথা বাজারে আছে তা এই ভাষণের সামনে টিকে না। ২৬শে মার্চ যে স্বাধীনতার ঘোষণা কোন অভিনব বিষয় ছিল না তার নির্দেশনা এই ভাষণে পাওয়া যায়।
এই ভাষণ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে সেই প্রশ্ন করা যায়। যেই শোষন এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান ছিল সেই শোষণ এবং বঞ্চনা কি শেষ হয়েছে?
নাগরিক অধিকার রক্ষার যেই শাসনকাঠামো বানানোর বাসনা এই ভাষণে ঘোষিত হয়েছিল তা কি হয়েছে?
আইন দর্শনের একটি প্রশ্ন আমরা আলাপ করতাম। নাগরিকের আইন অমান্য করার অধিকার আছে কিনা? থাকলে কখন? ৭ই মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের ইতিহাসে civil disobedience এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যখন কোন শাসক জনগণকে তাদের পছন্দমত সরকার গঠন করতে না দেয়, তাদের সাথে প্রতারণা করে, এবং নির্যাতন নিপীড়নের মাধ্যমে তাদের অধিকার অস্বীকার করে – তখন জনগণের নৈতিক অধিকার থাকে সরকার এমনকি রাষ্ট্রকে অমান্য করার। ৭ই মার্চে এদেশের জনগণ সেই নৈতিক অধিকারের চর্চা করেছেন। এই অধিকারের আলাপ আইনের কাঠামোর মধ্যে আর মিলবে না। কেননা আইন ঠিক করার প্রশ্ন এখানে জড়িত।
Civil disobedience ছাড়াও এখানে কিছু সাংবিধানিক অধিকার চর্চার বিষয় ছিল। বাকস্বাধীনতা, সমাবেশ, এবং সগঠিত হওয়ার অধিকার। সিভিল ডিজঅভিডিয়েন্স বা মহাত্মা গান্ধী ও মার্টিন লুথার কিংয়ের নন ভায়োলেন্ট এবং নন কোঅপারেশন মুভমেন্ট - সেসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সফল উদাহরণ ৭ই মার্চ। এই চরম উপায়ের রাজ-নৈতিকতার প্রশ্নের বাইরে বাংলাদেশে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক অধিকারগুলো কেমন আছে?
বাকস্বাধীনতা বা ফ্রিডম অব স্পিচের জন্য মানুষের যে Freedom from fear বা ভয়মুক্তির দরকার হয় – রাষ্ট্র কি মানুষকে সেই অভয় সংগীত শোনাতে পারছে? সমাবেশের অধিকার চর্চা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের বেআইনি অত্যাচার – পুলিশি হামলা – থেকে মানুষ কি নিরাপদ? বাংলাদেশ কি তার জনগণের সংগঠনের অধিকার চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করতে পারছে?

যদি না পারে তবে ৭ই মার্চ নিয়ে তামাশা করার ধৃষ্টতা আপনারা দেখায়েন না।

৭ই মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে। মার্চ ৬, ২০২১। নরমাল, ইলিনয়, যুক্তরাষ্ট্র।

শেড অ্যাকুরিয়াম

মে ৮, ২০২২ শেড অ্যাকুরিয়াম গেলাম। সকালে উঠলাম দেরিতে। দায়ীন ভাইয়ের সাথে কথা বলেছিলাম গতকাল। তিনি ছিলেন শেড এর কাছাকাছি। তার আরেক বন্ধুর সাথে...