Saturday, March 11, 2023

ঘরকুনো কচ্ছপ

অনেক গল্পেই ইতিহাসের ব্রহ্মদত্ত রাজা হিসেবে হাজির থাকেন, এ গল্পেও আছেন। আমার সাথে তার সাক্ষাত হয় নাই, তাহলে তার রাজমুকুটে কয়টা হীরামোতিপান্না ঝলঝল করত তা আপনাদের জানাতে পারতাম। এখন গল্প শুরু করা যাক।

_

এককালে ব্রহ্মদত্ত ছিলেন বেনারসের রাজা। আর বোধিসত্ত্ব জন্মেছিলেন গায়ের এক কুমোরের ছেলে হয়ে। তিনি কুমোরের কারবার দেখাশুনা করতেন। আর এক স্ত্রী এবং পরিবারের ভরণপোষণ চালাতেন। 


সেসময় বেনারসের বিরাট নদীর কাছেই একটা বড়সড় বিল ছিল। বর্ষায় পানি বেড়ে গিয়ে নদী আর বিল একাকার হয়ে যেত আর পানি কমলে তারা হয়ে যেত আলাদা। মাছ আর কচ্ছপেরা এমনিতেই জানতো যে কোন বছর বর্ষায় সব ডুবে একাকার হয়ে যাবে আর কখন খড়ায় সব শুকিয়ে যাবে।


যে বছর এই গল্পের, সে বছর বিলের মাছ এবং কচ্ছপেরা জানতো যে ভীষণ খড়ায় বিল শুকিয়ে যাবে; তাই যখন বিল আর নদী জলে একাকার ছিল তখন মাছ আর কচ্ছপেরা বিল সাঁতরে নদীতে চলে গেল। কিন্তু একটা কচ্ছপ ছিল যে নদীতে যায়নি, সে বললো - ‘আমার জন্ম এখানে, এখানেই বড় হয়েছি আমি, আর এখানেই আমার বাপমায়ের ঘরবাড়ি - আমি এ জায়গা ছেড়ে যেতে পারব না’। 


অতপর গ্রীষ্মে পানি সব শুকিয়ে গেল। সেই কচ্ছপ একটা গর্ত খুঁড়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখলো, যেখানে বোধিসত্ত্ব মাটি নিতে আসতেন। 


হাড়ি পাতিল বানানোর জন্য মাটি সংগ্রহের সময় হলো কুমোরের। বোধিসত্ত্ব আসলেন মাটি নেয়ার জন্য। বড় একটা কোদাল দিয়ে তিনি মাটি খুঁড়লেন। তাঁর কোদালের কোপে কচ্ছপের শক্ত খোলস ভেঙে গেলো, কোদালের সাথে উঠে মাটির দলার মত পড়ে রইল সে। নিদারুণ যন্ত্রণার ভেতর সেই প্রাণী ভাবল - ‘এই আমি মরে যাচ্ছি, কারন আমার ঘরের প্রতি এতটাই আসক্ত ছিলাম যে তা ছাড়তে পারি নাই।’ তারপর সে এক শোকের গীত গাইলো:


এই মাটিতে জন্ম আমার, ঘরও ছিলো, বড় হলাম ছোট থেকে;

এই মাটি আজ আমার জন্য মরণখেলা আনলো ডেকে।

তোমারে কই,  ভাগ্য অমার, তোমারে কই একটু শোনো -


সুখ যদি পাও যাও সেখানে, হওনা সেথায় অচিন তুমি;

উজল শহর/গহিন বনেও, প্রাজ্ঞরা পায় জন্মভূমি।

যাও সেখানে, জীবন যেথা; ঘরেই কেন মরণ বোনো?


মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে বোধিসত্ত্বর কাছে তার শোকের গীত গাইতেই থাকলো। বোধিসত্ত্ব তারে তুলে নিলেন এবং গ্রামের সব লোকরে জড়ো করে নসিহত করলেন: ‘এই কচ্ছপটারে দেখো। যখন অন্য মাছ এবং কচ্ছপরা বড় নদীতে গেল, সে তার ঘরের আরাম ছাইড়া যাইতে পারলো না। সে নিজেরে লুকাইলো আমি যেখান থেকে মাটি আনি সেই মাটির ভিতর। আমি তখন মাটি খুুঁড়তেছিলাম আর আমার বড় কোদাল দিয়া তার খোলস ভাইঙ্গা ফেললাম। একটা বড় মাটির দলা ভাইবা আমি তারে কোদাল দিয়ে টাইনা তুললাম। তখন সে আমারে বললো সে কি করেছিলো। দুই শোলক কবিতায় সে তার করুণ ভাগ্যের কথা বিলাপ করে কইলো আর এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো।


তোমরা দেখতে পাইতেছো যে সে তার ঘরের প্রতি খুবই আসক্ত ছিল। তোমরা এই কচ্ছপের মত হয়ো না। নিজেরে বুঝায়ো না যে, ‘আমার চোখ আছে, আছে কান, এখনো ঘ্রাণ পাই, পাই স্বাদ, স্পর্শে এখনো বুঝি, আছে এক ছেলে আর মেয়ে এক, আমার সেবা যত্নের জন্য আছে অনেক কাজের লোক - কাজের বেটি, আছে অনেক স্বর্ণ খাটি।’ গভীর কামনা বাসনায় এইসব আঁকড়ায়ে থাইকো না। সব প্রাণই অস্তিত্বের তিনটা স্তর পার করে।


এভাবেই তিনি বুদ্ধ স্টাইলে ওয়াজ করলেন উপস্থিত জনতারে। তার সেই নসিহত ভূভারতের সর্বত্র ছড়ায়ে পড়লো এবং সাত হাজার বছর ধরে মানুষ মনে রাখলো সে ওয়াজ। জনতা তা মনে রাখলো, দান সদকা করলো, এবং স্বর্গে যাবার আগ পর্যন্ত মানলো সেই নসিহত।

_

ঘরকুনো কচ্ছপ। জাতকের গল্প। ইংরাজি থেকে অনূদিত; গীতটুকুও। 

_

#পাগলা_ডুমুর

_


Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International License.

Monday, January 9, 2023

দুই শিকারি

মে মাসের একদিন হর্ষ এবং বিষাদ দেখা করলো এক লেকের পাড়ে। তারা একে অপরকে শুভেচ্ছা জানালো। এবং শান্ত জলের পাশে বসে আলাপ করলো।

হর্ষ বললো দুনিয়ার বেবাক সৌন্দর্যের কথা, এবং বনে-জঙ্গলে পাহাড়ে-পর্বতে প্রাণের বিস্ময়ের কথা, এবং সেসব গানের কথা যা সে শুনেছে ভোরে এবং সাঝে।

বিষাদও বললো কথা। এবং সে একমত হলো হর্ষের সকল কথায়। কেননা বিষাদ সময়ের জাদু এবং তার সৌন্দর্য সম্বন্ধে জানতো। মাঠে এবং পাহাড়ে মে ফুলের কথায় বিষাদ মুখর হয়ে উঠলো।

হর্ষ এবং বিষাদ পরস্পরে বললো বহু কথা; এবং তারা যা জানতো সেসব বিষয়ে তারা একমত হলো।

তখন লেকের অপর পাড় দিয়ে যাচ্ছিল দুই শিকারি। এবং তাদের একজন পানির ওপর দিয়ে তাকাল এবং বললো 'আশ্চর্য! এই লোক দুজন কারা?' এবং অপরজন বললো - ‘দুইজন - বললা তুমি? আমি ত দেখি কেবল একজন।’

প্রথম শিকারি বললো - ‘কিন্ত দুইজন আছে’। দ্বিতীয়জন বললো - ‘আমি শুধু একজনকে দেখতে পাচ্ছি, আর পানিতেও একজনের প্রতিচ্ছবি।’

‘না। দুইজন। আর পানিতেও দুইজনের প্রতিচ্ছবি।’ - প্রথম শিকারি বললো এবার।

দ্বিতীয় লোক আবার বললো ‘মাত্র একজনকেই আমি দেখতে পাচ্ছি।’ আর অপরজন বললো 'আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি দুইজনকে।’

আজকের দিনতক এক শিকারি বলে যাচ্ছে অপরজন চোখে ডাবল দেখে; আর অপরজন বলছে ‘আমার বন্ধু চোখে কম দেখে।’
‍
~
মূল - কাহলিল জিবরান
অনুবাদ - লোকমান বিন নুর
#পাগলা_ডুমুর


Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International License.

অন্য ভবঘুরে

একবার আরেক ভবঘুরের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। সেও কিছুটা পাগলা টাইপের। আমারে সে বললো:
“আমি এক ভবঘুরে। প্রায়ই মনে হয় আমি মাটির উপর পুচকে মানুষদের সাথে হাঁটছি। এবং যেহেতু আমার মাথা মাটি থেকে তাদের মাথার চেয়ে সত্তুর হাত উপরে, তাই আমার মাথায় মুক্ত এবং উচ্চ চিন্তা তৈরি হয়।

কিন্তু আসল ব্যাপার হচ্ছে আমি মানুষের মাঝে হাঁটি না, আমি চলি তাদের বহু উপরে। এবং তারা শুধু তাদের জমিনে আমার পায়ের চিহ্ন দেখতে পায়।

আর আমি প্রায়ই শুনি তারা আমার পদিচহ্নের আকার-আকৃতি নিয়ে আলাপ এবং তর্ক করছে। কেউ কেউ আছে যারা বলে ‘এসব হচ্ছে অতীতের অতিকায় প্রাণীদের ছাপ।’ আর অন্যরা বলে, ‘না, এসব হচ্ছে বহুদূর নক্ষত্র হতে ঝরে পড়া উল্কার দাগ।’

কিন্তু তুমি, বন্ধু আমার, তুমি তো ভাল করেই জানো যে এসব মস্ত কোন প্রাণীর ছাপ বা উল্কার দাগ নয়, বরং তারা শুধু এক ভবঘুরের পদচিহ্ন।”

_
মূল: কাহলিল জিবরান
অনুবাদ: লোকমান বিন নুর
#পাগলা_ডুমুর

Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial 4.0 International License.


Friday, September 23, 2022

পাগলা ডুমুর ২


ঈশপের এক ব্যাঙ ছিল। ব্যাঙের মাথায় মনি কিংবা সাতরাজার ধন ছিল কি ছিল না, তা তিনি বলে যাননি। বরং নীতির গল্প বলে গিয়েছিলেন। যখন পৃথিবীতে হাতুড়ে ডাক্তারদের আগমন ঘটেনি তখনকার কথা। সেই কুয়োর ব্যাঙ গ্যাঙর গ্যাঙর গ্যাঙ - নিজেরে ঘোষণা দিল মহাকবিরাজ হিসেবে। ব্যাঙের ভাষা ব্যাংরেজিতে সে বক্তিমা দিয়ে দিয়ে বিদ্যে জাহির করলো। কঠিন অস্পষ্ট ধ্বনিসমষ্টির ভাণ্ডার নিয়ে বন-জলের সকল পশুপাখিমৎসকূলের রোগনিরাময়ের ঘোষণা দিল সে। এমন কোন অসুখ বিসুখ নেই যা তার বিদ্যা ও নিরাময়ের অতীত। কেউ মানতে না চাইলে ব্যাংরেজির কঠিন পরিভাষা অপরিচিত শব্দবাক্য হাজির করে ভড়কে দিয়ে তবে স্বীকৃতি আদায় করে ছাড়তো। উত্তরাধুনিক গম্ভীর-জটিল-সজারুকাটা দর্শনের সাথে সেসবের সামান্য মিল থাকতে পারে। আর বহুকালের শাস্ত্রশ্লোক অনর্গল উচ্চারণের রীতির সাথে তার দূরত্ব বেশি নয়। এইভাবে মহাকবিরাজ কুয়োর ব্যাঙের চিকিৎসাপদ্ধতি চলছিল বনপ্রাণে। মহাকবিরাজকে প্রশ্ন করে সেই সাধ্য কারো নেই।


একদা এক শেয়াল, তখনো তার নামের পরে পণ্ডিত উপাধি যুক্ত হয়নি, সেই মহাকবিরাজকে জিজ্ঞাসিল - কবিরাজ মশায়, আপনে ত সকলের রোগবালাইবদসুরতের দাওয়াই জানেন, তবে এমন এবড়ো দেহ, থেবড়ো মুখ, ডেঙা ল্যাটকা ঠ্যাং আর বিশ্রি স্বরের গ্যাঙর গ্যাঙর গ্যাঙ কণ্ঠস্বর নিয়ে আপনকার করুন জীবনের দাওয়াই কি কিছু পেয়েছেন? মানে আপনে সকলের রোগ সারান, আপনার নিত্যজ্বর সারবে কিভাবে?


সেই থেকে ব্যাঙেরা মহাকোবরেজ বা সব্বার ডাক্তার হওয়ার দাবি ছেড়ে দিয়েছেন। আর মানুষেরা কিংবা ঈশপেরা বুঝে গিয়েছে যে নিজের ব্যামো সারাইতে পারে না, তার কাছ থেকে সমাধান নেয়ার বেলায় সতর্ক থাকতে হবে। অন্তত শিয়ালের মত, আজ্ঞে শিয়াল পণ্ডিতের মত, সন্দেহ জানায়ে রাখতে হবে।

-
ঈশপের ব্যাঙ/ পাগলা ডুমুর ২
জ্যামাইকা, ০৯/২২/২০২২

Thursday, September 8, 2022

আকবর আলি খান


বিতর্ক চর্চার জন্য তাঁর চিন্তার সাথে পরিচয় হয়। 'পরার্থপরতার অর্থনীতি' অর্থনীতি বিষয়ক বিতর্কের জন্য অনেকটা রেফারেন্স হিসেবে পড়তাম।

ফোর্থ ইয়ারে চিনলাম তার বই Discovery of Bangladesh: Explorations into the dynamics of a hidden nation. ইংরেজি বই পড়ে হজম করা তখন দুঃসাধ্য ছিল। ২০১৪ তে সে বইয়ের বাংলা পড়লাম - 'বাংলাদেশের স্বত্তার অন্বেষা'। বাংলাদেশের গ্রাম বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ যেন কতকিছু একসাথে দেখায়ে দিল। জাতিবাদ বুঝতে পারলাম যেন। বহুজাতির ভারতকে একমাত্রার মহাভারতীয় ঐতিহ্য হিসেবে প্রচারের ফাঁকফোকর দেখা গেল। (বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রসার বিষয়ে তার তত্ত্ব খুব কনভিন্সিং না হলেও ইউনিক। তিনি নিজে তা আপডেট করেছেন কয়েক বছর আগে। তবে তার ডিসকভারি অব বাংলাদেশ থেকে খুব পরিবর্তন করেছেন বলে মনে হয় না।)

তার বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছে দুয়েকবার। আইন বিভাগে এথিকস ক্লাব থেকে দিনব্যাপী ওয়ার্কশপ আয়োজন করেছিলাম আমরা। সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত সেই ওয়ার্কশপে বিচার বিভাগের করাপশন নিয়ে শিরোনাম ফোটানো মন্তব্য করেছিলেন: 'বিচার বিভাগ জুয়ার আড্ডায় পরিণত হয়েছে'।

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের বন্ধ্যাত্বের সময়ে তিনি কখনো কথা ও চিন্তায় আপোষ করেননি, নীরবতার পাপে পাপী হননি। তার কলিজাভরা সাহস মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে পাকাপোক্ত হয়েছে, যে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের রায় হয়েছিল।

বাংলাদেশের দুঃখ হচ্ছে বাংলাদেশে আরো আরো পেশাদার আমলা বুদ্ধিজীবীদের সাথে তার তুলনা করলে মেরুদন্ড আর কলিজার জায়গায় আপোষ আর হতাশা পাওয়া যাবে।

জীবনের শেষ পর্যন্ত এত প্রোডাক্টিব ছিলেন তিনি, তা অসাধারণ অনুপ্রেরণার। কয়েকমাস আগে পড়লাম তাঁর 'অবাক বাংলাদেশ' বই থেকে। প্রধানমন্ত্রী পদে কতবার থাকা যাবে তা সীমিত করার মাধ্যমে নির্বাহী ক্ষমতা এবং তার এবিউজ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে - এমন প্রস্তাবের পক্ষে গেইম থিওরি থেকে যুক্তি দিয়েছেন।

লেখক হিসেবে তার রসবোধ আর গবেষণা দক্ষতা সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো অসাধারণ। সৈয়দের সাথে তফাৎ - তিনি সাহিত্য সমালোচনা লিখলেও ক্রিয়েটিভ রাইটিং প্রকাশ করেননি।

আকবর আলি খানের জীবন সুন্দর জীবনের নমুনা। লোকেরা বলে 'এমন জীবন করিবে গঠন, মরনে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন;' তাঁর জীবন তেমনি সুন্দর।

খোদা, আমাদের বুদ্ধিজীবীদের আকবর আলি খানের মত কলিজাভরা সৎসাহস দিও; সুন্দর জীবন দিও…

(পুনশ্চ: Freakonomics আর Superfreakonomics এর অনুবাদ 'আজব ও জবর আজব অর্থনীতি'তে যেসব ক্রিটিক বাংলায় হাজির করেছেন তা বহু পাঠককে ইকনোমিকসে আর গবেষণায় উৎসাহিত করবে।)

_

৮ সেপ্টেম্বর ২০২২



Monday, April 18, 2022

বিসিএস ক্রেইজ এর কারন

বাংলাদেশে পাবলিক সার্ভিসের জন্য লোকেরা কেন খুব আগ্রহী হয় এর একাধিক ব্যাখ্যা হতে পারে। যেমন -

১. ঐতিহাসিকভাবেই শিক্ষা অর্জনের পর সরকারি চাকরি করার এক অলিখিত নিয়ম (নর্ম) তৈরি হয়েছে। উপনিবেশ আমল বা তারও আগ থেকে শিক্ষিত হওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় চাকরি পাওয়ার ধারা চলে এসছে। যদিও তাত্ত্বিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজই হচ্ছে সেই কর্মীশ্রেণী তৈরি করা। শিক্ষার শুরু রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য শেখানোর মাধ্যমে। আর তার পরিপক্বতা রাষ্ট্রের কর্মী হওয়ায়। উপনিবেশ শাসনের সাফল্যের সাথে সাথে এই নর্ম পাকাপোক্ত হয়েছে। তাছাড়া আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরিই হয়েছে রাষ্ট্রের জন্য আনুগত্য তৈরি এবং রাষ্ট্রের কর্মী উৎপাদনের জন্য। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্দেশ্যের সাথে পাবলিক সার্ভিসের জন্য আগ্রহী হওয়ার সামঞ্জস্য বরং সেসব প্রতিষ্টান তৈরির সাফল্যের নমুনা।


তাছাড়া বাংলা মুলুকে পুঁজিবাদের বিকাশ এখনো অসমাপ্ত। পুঁজিবাদের অসমাপ্ত বিপ্লব সমাপ্ত করার নামে অনেকেই তা লুটপাটের মাধ্যমে বেহাত করে দিচ্চে। উপনিবেশ কাল থেকে বাংলা যেই সস্তাশ্রম এবং কাঁচামালের উৎস ছিল/হয়েছে সেসবের জন্য শিক্ষার প্রয়োজন ছিল না। উপনিবেশকালে শিক্ষা বরং সেসবের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল। সম্ভবত উপনিবেশি রাষ্ট্র এবং বাজার শিক্ষার সাথে সমান্তরাল সম্পর্কের মধ্যে ছিল না। এসব প্রশ্ন আলাদা করে বলা যায়, সরকারি চাকরির প্রতি যে ক্রেইজ তা নতুন কোন ব্যাপার নয়। বরং বহুকাল আগে থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরির সাথে সরকারি চাকরির সম্পর্ক রয়েছে।


২. সরকারি চাকরির জনপ্রিয়তায় ভাটার সময় তুলনামূলক কম। একইভাবে এখনকার মত বিসিএস ক্রেইজ বা উত্তাল জোয়ারও সবসময় ছিল বলা যাবে না। যেহেতু রাজনৈতিকভাবে বর্তমান শাসনআমল অনেক বেশি আমলানির্ভর - কাজেই পাবলিক সার্ভিসের সুযোগ সুবিধা কিছুটা ইমপ্রুভ করেছে। আর জনগণের ভোটের চেয়ে আমলাতন্ত্রের উপর নির্ভরশীলতা পাবলিক সার্ভিসের লোকদের ক্ষমতার পরিমান বাড়িয়েছে (এট লিস্ট ইন পারসেপশান)। এছাড়া বর্তমান শাসন যেহেতু মিলিটারি শাসন নয়, তাই মিলিটারি শাসনের সময়কার চেয়ে পাবলিক সার্ভিসের এই ক্ষমতার পরিমান বেশি। সবমিলিয়ে অগণতান্ত্রিক শাসনের সাথে বিসিএস বা পাবলিক সার্ভিস ক্রেইজ গভীরভাবে সম্পর্কিত বলা যায়। বাংলাদেশে বেসরকারি চাকরি বাজারের দাপট কমে যাওয়া রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য হয়তো ভাল নয়, তবে তা বিসিএস ক্রেইজ তৈরির আরেকদিক; সম্ভবত কারনও। প্রাইভেট সেক্টরকে কতটা পলিটিসাইজ করা হয়েছে, কতটা করলে তার বাঁচার সুযোগ আছে এবং তা ইকনোমিকে সচল রাখতে পারবে - সেসব যারা বুঝেন তারা হয়তো ভাল ব্যাখ্যা করতে পারবেন। এককথায় বললে - বাংলাদেশে অগণতান্ত্রিক শাসন বিসিএস ক্রেইজ তৈরি করেছে।


৩. ব্যক্তির জায়গা থেকে হিসাব করলে বিষয়টা হচ্ছে - পড়ালেখা কেন করে লোকেরা? এতো আয়োজন খরচ সাধনা - এসবের উদ্দেশ্য কি? ভাল জীবন যাপন করা। আধুনিক শিক্ষায় মানুষ হওয়া, সুনাগরিক হওয়া - এসব বায়বীয় উদ্দেশ্যের পাশাপাশি কঠিন কিংবা তরল উদ্দেশ্য হচ্ছে উপার্জনের জন্য সক্ষম হওয়া। শারীরিক শ্রমের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমে উপার্জনের সুযোগ যেহেতু বেশি তাই বিদ্যার্জন দরকারি। এছাড়া ব্যবসাপাতি করার জন্য যে ধরনের ট্রেনিং বা আগ্রহ দরকার হয় তা যাদের থাকে তারা সেগুলো শুরু করে দেয় তাদের সময়মতো।


(আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষার সাথে পরকাল জোড়া দেয়া হয়, আর ক্বওমীতে ইহকালকে একটু বেশি পরিমাণে মার্জিনে রাখা হয়। ধর্মীয় শিক্ষার ভেতর আবার দারিদ্র্যকে মহত করা হয় তুলনামূলক বেশি। সম্পদকে প্রধানত নিন্দা করা হয়।)


যাহোক, যে ভাল জীবন মানের জন্য শিক্ষা অর্জন করে লোকেরা সেজন্য দেশের যে সম্পদ তা যথেষ্ট না। বহু পুরানো কথা। মানুষের যা অভাব তা অসীম, আর সম্পদ সীমিত। বাংলার বেলায় একথা আরো বেশি প্রযোজ্য। বাংলা একটি দরিদ্র দেশ। এ ছাড়া বাংলা আসলে মাটি আর পানির দেশ। সোনার বাংলা শুনতে যত আনন্দ লাগুক, বাংলাদেশে কোন সোনার খনি নেই। দেশীয় উৎপাদনসহ সম্পদ যা আছে তাতে কাড়াকাড়ি প্রচণ্ড। প্রতিযোগিতা না বরং কাড়াকাড়ি। কাজেই ক্ষমতার বদলাবদলির সাথে এখানে লুটপাটের সম্পর্ক খুব স্বাভাবিক। কে সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিবে এটাই এখানকার রাজনৈতিক দলগুলোর একটা প্রধান লক্ষ্য।


পড়ালেখা করে লোকেরা সম্পদের ভাগ তথাকথিত মেরিটের ভিত্তিতে পাওয়ার জন্য। এই নীতিকে লোকেরা বলে মেরিটোক্রেসি বা মেধা তন্ত্র। আর রাজনীতিও লোকেরা করে সম্পদের ভাগ পাওয়ার জন্য। সেই ভাগ পাওয়ার ব্যাপারটা নিয়মকানুন দিয়ে হয় না; তাই তার আলাদা নাম লুটপাট। মধ্যবিত্ত বাঙালি শিক্ষার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ভাগাভাগির একটা অংশ চায় এবং সেটাকেই সবচেয়ে ন্যায্য মনে করে তাই তার কোটাবিরোধী আন্দোলনের দরকার হয়। একটা নিয়ম তো থাকা দরকার।


মূলকথা হচ্ছে বাংলাদেশে পাবলিক সার্ভিস রাষ্ট্রের সম্পদ বণ্টনের একটা গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। বাকিসব মহত্ত্ব পাবলিক প্রাইভেট এমনকি প্রায় সকল পেশায় কমবেশি পাওয়া যাবে। দরিদ্র মাস্টাররা অবশ্য সম্পদ কম পায় বলে মর্যাদার ভাগ একটু বেশি পায়। এছাড়া ক্লিনারের কাজও যেকোন পেশার মত সমানভাবে মহত। কাজেই পড়ালেখা শেষ করে আপনি একটা ভাল চাকরি চাইবেন এবং চাইবেন লোকেরা আপনাকে বিশেষভাবে মহত মনে করুক - প্রথমটা ঠিক আছে দাদা, পরের বিষয়ে বলতে হয় আসলে পেশার কারনে আপনি যতটা মহত ভাবেন নিজেকে অন্য পেশা ইত্যাদির লোকেরাও তাই।
তৃতীয় ব্যাখ্যার সামারি হচ্ছে যেহেতু রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনের উপায়ের মধ্যে বিসিএস প্রায় এক নাম্বারে আছে - তাই মানুষের আগ্রহও তাতে বেশি।
(এই লেখায় কেউ দুঃখ পেয়ে থাকলে আমি আপনার সাথে সমব্যথী; এটি কোন একক ব্যক্তির পর্যালোচনা নয়, বরং সমাজ সম্পর্কে অনুমান/পর্যবেক্ষণ।)


এপ্রিল ৪, ২০২২

শেড অ্যাকুরিয়াম

মে ৮, ২০২২ শেড অ্যাকুরিয়াম গেলাম। সকালে উঠলাম দেরিতে। দায়ীন ভাইয়ের সাথে কথা বলেছিলাম গতকাল। তিনি ছিলেন শেড এর কাছাকাছি। তার আরেক বন্ধুর সাথে...